‘অহেতুক মানুষ’ বই থেকে কবিতা || কিরণ আকরামুল হক

ওড়ং

 

চিঠির শেষ কলামে লেখা ছিলো- মোড়ক উম্মোচন
অথচ লাঠির মাথায় নারিকেল মালা লাগিয়ে
নাম দেওয়া হলো ওড়ং; তারপর
স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ মিশিয়ে ঘুটে দেয়া হলো
সেই থেকে জম্ম হলো- সমস্ত পবিত্র গ্রন্থ।
পাহাড়গুলো ভাত-যুদ্ধে লিপ্ত হলে হোক
তাতে কি আসে যায়? শেষ পৃষ্ঠায় বর্ণগুলো
ছোট্ট করে লিখে নেবে শোক।

 

 

নোবেল

 

কাতালান স্বাধীনতা পাবে— সেই খবরে আমি ঘুমকে নির্বাসন দিয়ে ধানমন্ডির রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকি, মনের মানুষ খুঁজে ব্যর্থ হই। রাত গভীর হলেই গরু-মহিষেরা সারি বেঁধে হেঁটে যায়। পিছন পিছন ছুটে চলে কয়েকজন বাঙাল মেন্ডেল। সকাল হলেই চামড়া ছিলা মহিষগুলো গরু হয়ে যাবে।

আমি ল্যামপোস্টে ঝুলে থাকা ধর্মযাজক গেগর জোহান মেন্ডেলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিকোটিনে সুখ টান দেই। মেন্ডেল চার্চ ফেলে আইনের রশি হাতে আমার দিকে ধেয়ে আসে, নিকোটিন হাতে তুলে দিয়ে মনে করিয়ে দিলাম ষোড়শীর রসালো ঠোঁটের কথা। এখন আমি রোড ডিভাইডারে হেলান দিয়ে শুয়ে আছি। বিহঙ্গ, আশীর্বাদ, বাহন আর ২৭ নম্বর বাস আমার বুকের উপর দিয়ে চলে গেলো। ভোদাই মেন্ডেল এখনো নিকোটিনকে ললিপপের মতন চুষে যাচ্ছে, ওদিকে লাস ভেগাসে গুলির শব্দে আলফ্রেড নোবেলের ঘুম ভেঙে গেলো, উনি উঠে এসে বাংলার মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন।

 

 

 

সেগুন কাঠের দরোজা

রাত গভীর হলেই দাঁড়িয়ে যায় সেগুন কাঠের দরোজা
প্রজাপতির রঙগুলো তখনো নীল কাঁচ ভেদ করে বের হয়নি
চারপাশে ডুয়ো অন্ধকার জেঁকে বসলে গুহামুখ কেন জানি
উম্মুক্ত হতে গিয়েও হলো না, শৃঙ্খলিত হলো মাকড়শার জালে,
পাশ ফিরতেই কুয়োর ভেতর অনিন্দ্য নূপুর।

আর প্রেমিক শব্দঋণ ভুলে হারিয়ে গেলো কদমফুলে
ততক্ষণে ওপাশ থেকে এলো অভিমানের চিঠি।

 

 

চোখ

মেঘ আর পাতার মিশেলের সেই গোধূলি বেলায়
সূর্য নেমে গেলো মেঘের আড়ালে।
লেকের পাড়ে বেঞ্চিতে বসা ফড়িং এর চোখে চোখ
রহস্যাবৃত ভাষার কালো হরফে লেখা হলো- শোক।

আঁধারে  জ্বলে ওঠে নিয়ন বাতি
আর বেজে ওঠে ঘোষণার বেরসিক বাঁশি।

প্রেম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে
শহর মেতেছে মোনালিসা’র রহস্যময় ঠোঁটে!
অথচ মহাকাব্য গেঁথে আছে মন ফড়িঙের চোখে।

 

 

বিশ্বায়ন

আমি পরাজিত সৈনিক, আবার জেগে উঠব
আমি জিতে নেবো, দ্রুতই জিতে নেবো
ততদিনে এ অশান্ত বুকে গড়ে উঠুক দুঃখের বনায়ন।

আমি ভন্ড সাধু, মন ভাঙাই আমার কাজ
আমি ভেঙে ফেলবো, দ্রুতই ভেঙে ফেলবো
ততদিনে এ হৃদ সমুদ্রে গড়ে উঠুক অশান্ত নগরায়ন।

আমি ভুল করে ভুলের ভেতর ঢুকে গেছি;
আমি সুধরে নেবো, দ্রুতই সুধরে নেবো
ততদিনে প্রেমিকার বুকে ঘটে যাক বিশ্বায়ন।

আমি শেষের পেরেক, সেঁটে থাকাই আমার কাজ
আমি সেঁটে যাবো, দ্রুতই সেঁটে যাবো
ততদিনে প্রেমিকার অন্তর্বাসে ঘটুক বনায়ন।

 

 

 

খোয়াড়

দড়ি ছেঁড়া গরু গৃহস্থের ক্ষেতে মুখ দিয়ে
চিনেছিলো— পার্শ্ববর্তী তালেব মোল্লার
বাঁশের বাখারি পোঁতা আইনের খোয়াড়!
অথচ আইন মেনে উপত্যকায় মুখ গুঁজে
আমাকে চিনতে হলো— তোমার বুকে
বিধাতার নিজ হাতে গড়া শৈল্পিক খোয়াড়।

 

 

স্বপ্ন

তোমরা যখন জরাজীর্ণ ছেঁড়া কাঁথায় মুখ লুকিয়ে
অন্ধকারে জলজলে বিড়ালের চোখে বিশ্ব দেখো,
আমি তখন নগ্ন শরীরের উষ্ণতা নিবারণে
প্রজম্মের শিকড় গাড়ি রসালো উপত্যকায়।
মুচকি হেঁসে জানান দিই, ওরা কাঁদতে আসছে না
ওরা জয় করবে।

তোমরা যখন সভ্যতা নামের ছামিয়ানা টাঙিয়ে
বৃষ্টির অঝর ধারা বেঁধে শুষ্ক থাকো।
আমি তখন বিস্মৃত প্রান্তরে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে
অমৃত সন্ধানে বৃষ্টির জলে ভিজতে থাকি
ভেজা কাপড় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে শরীরে কম্পন তোলে
সর্দি কাশির চাপে ফুসফুসের নালীরা বদ্ধ,
অথবা হৃৎপিন্ডের রক্ত সঞ্চালনের বাঁধা হয়ে
আমি সাম্যের গান গাই।

তোমরা যখন ধুলিঝড়ের মধ্যে রঙিন চশমা পরে
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রাস্তায় হেঁটে বিশ্ব দেখো।
আমি তখন ধুলিকণায় খুঁজে ফিরি
উষ্ণ শরীর কিম্বা মাতৃগর্ভ!

যেখানে জম্ম নেবে মনুষ্য শিশু
যেখানে জম্ম নেবে দুর্দান্ত কৈশোর
যেখানে জম্ম নেবে বিশ্ব নেতৃত্ব
যেখানে জম্ম নেবে বিশ্ব সভ্যতা।

 

 

চক্র

প্রতিটি সন্ধ্যায় সদর দরোজা চোখ করে দাঁড়িয়ে থাকে
দিনের সকল কর্মযজ্ঞ শেষে ঘরে ফিরলে খুলে যায়।
ভেতরে প্রবেশ করে দেখি অপেক্ষার প্রহর শেষে
ঘরে বয়ে যায় হিমেল হাওয়া; আমার ক্লান্তি জুড়ায়
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ি, পাখির ডাকে পুনর্জন্ম হয়।

তারপর বেড়িয়ে পড়ি কাজে
আবার ক্লান্ত হই; ঘরে ফিরি
দরোজার চোখে চোখ রেখে
গল্প করি
ভেতরে এসে আবার মৃত্যুর প্রস্তুতি নিই,
মৃত্যুকে আলিঙ্গন করি।
পাখির জন্য অপেক্ষায় থাকি……….

 

 

 

মধ্যবিত্ত বিকেল

মধ্যবিত্তের কখনো বিকেল ছিলো না!
শিশুকালে স্কুল শেষে নারকেল ব্যাট হাতে মাঠ
অথবা মার্বেল পকেটে পাড়ার ঘরকাটা বারান্দা
আর খানিক বাদে ক্লাস শেষে
ক্যান্টিনের আড্ডা রেখে
দু’টো তক্তা বিস্কুট আর চিনি ছাড়া লাল চা।

অফিস ফেরত ঘর্মাক্ত কাপড়ে পুরনো লাল চা
গভীর রাতে দরজা ডিঙিয়ে আদরে জড়িয়ে
ঘন কেশে মুখ গোঁজার চেয়ে
তেল নুন মরিচের ফর্দ হাতে বেরিয়ে পড়া।

শেষবেলায় হয়ত ছোট ছেলেটা মুখ ফসকে
বলেই ফেলে, শালা টিপিক্যাল বাঙালি!
আসলে মধ্যবিত্ত কখনো বিকেল হয় না।

বয়েস বেড়ে গেলে বউমার বাজারদর
সাথে নাতী নাতনীর চকোলেট
অথবা কোচিং ফেরত বইয়ের বস্তা।
অখণ্ড অবসরে ডাক্তারবাড়ির খোঁজ
বুড়ির কাশের ঔষধ, পুরোনো রোগশোক
অনেকটা পথ হেঁটে হাঁপিয়ে কুঁজো হলে
পাড়ার ছেলেগুলোর সাধের উট।

আর বুড়ির খুকখুকানির শব্দে ঘুমটাও পড়শি
আঁড়মোড়া কেটে জড়িয়ে ধরতে গেলে
ফোকলা দাঁতে হেসে ওঠে ঘরের পিচ্চি বাচ্চাটাও
সাথে বুড়ো বয়সের ভীমরতি!

ততদিনে ঈশ্বর ডেকে নেয় পাপমোচনের গল্প ফাঁদে
দু’কাঠা মসজিদে অথবা মদীনার টান।
সময় তখন মধ্যবিত্ত বিকেল!

 

 

 

ভারপ্রাপ্ত

ভারপ্রাপ্ত কারিগরের দাওয়াতে আলোচনার টেবিল গরম করে ফিরে এলাম। দেখি, যে কারিগরের ম্যাটারনিটি লিভে উনি ভারপ্রাপ্ত হলেন, তিনি শিঁকে ছিঁড়ে লটকে আছেন ফারাক্কা’র পিলারে। কষে দিয়ে চলেছেন ঝাঁকুনি। ঝাঁকুনি সহ্য করতে না পেরে খুলে গেলো কপাট। ভারপ্রাপ্ত কারিগরের সুঁড়সুঁড়িতে দিদি’র খসে যাওয়া জলে বানভাসী একদল ক্ষুধার্ত চোখ তাকিয়ে আছে নীল আকাশের ক্যানভাসে।

ভারপ্রাপ্ত শিয়াল আকাশ পানে চেয়ে দাঁত কেলিয়ে মুঁচকি হাসছে। ততক্ষণে ভেতর বাটীর নালীপথে হাবুডুবু খায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত সুখ।

 

 

সমাধি

বছর চারেক হলো এখানে শুয়ে আছি
আঁটোসাঁটো চারকোণা ঘর মাটির দেয়াল
পাশ ফিরে শোবো সে সুযোগ নেই
উঠে বসার তো নেই-ই!

আজ পাশের ঘরে যে মেয়েটিকে ওরা রেখে গেলো
সে একসময় আমার খুব পরিচিত ছিলো
পার্কের বেঞ্চ, স্বপ্নচত্বর, ক্যাফেটেরিয়া
হাতির কবর কিংম্বা যমুনাসেতু তার নিরব সাক্ষী
বাদামের খোসা ছড়াতে ছড়াতে
খুনসুটিতে মেতে কত দিন কেটেছে
তার হিসেব বেশ কঠিন-ই!

আজ যখন পাশের ঘরে এলো; একতোড়া ফুল নিয়ে
ওকে স্বাগত জানাতে খুব ইচ্ছে করছিলো
কিন্তু আশেপাশের ফুলের বাগানগুলো
কেমন যেনো নেতিয়ে পড়েছে-শোকে।
যেদিন আমাদের শেষ দেখা হলো-
ওর ডান হাতের কনিষ্ঠা ধরে ঝুলছিলো
একটা শিশু
আর বামপাশে দাঁড়িয়ে ছিলো- আমার বন্ধু রশিদ
সিভিল সার্ভিসের বড় কর্মকর্তা
নাম-ডাক নেহাত কম না, যা দেখে
মেয়েটি ক্ষুদ্র কেরানির হাত ছেড়েছিলো।

যাক সে কথা,
কাছে যখন এসেই পড়েছে-স্বাগত জানিয়ে আসা যাক!
অবসরে ভাবা যাবে..

 

 

এপিটাফ

এপিটাফে কালো হরফে লেখা-
“ঈশ্বর!
মৃত্যুঃ ১৯৮৯ সাল।”
অবাক হইনি, কেন জানেন?
পিছু নিয়েছিলাম- সেই কবে!

পবিত্র মাঠ, পবিত্র ঘর, তীর্থস্থান
এমনকি হোটেলে রুম কোথাও বাদ রাখিনি।
অতএব মেনে নিয়েছি!

 

 

কচুখোর

প্রায়শই আমার পাপগুলোর সাথে আদরে জড়িয়ে
ঔরশজাত আত্মাগুলো ফেলে আসি পৃথিবীর স্বর্গে!
ওরা প্রতিনিয়ত কাঁদে, পৃথিবীর আলোয় ভাসতে চায়
আমি পোষা ময়নার মতন শিখিয়ে পড়িয়ে দেই
এখানে মানুষ থাকে না, থাকে কচুখোর!

 

 

তুমি ফিরে এলে

উপত্যকা বেয়ে যে অজগর হেঁটে গেলো
সে রিজার্ভ ফরেস্ট বোঝে না,
বৃক্ষ বোঝে।

চা বাগানের গলি ধরে যে কলম হেঁটে গেলো
সে গভীর কূপ বোঝে না,
রঙ বোঝে।

শুভ্র বরফের দেশ হতে যে পাখি উড়ে এলো
সে দু’নলা বন্দুক বোঝে না,
হাওর বোঝে।

তুমি ফিরে এলে ওরাও বুঝে নিতো
রিজার্ভ ফরেস্ট, গভীর কূপ কিংম্বা দু’নলা বন্দুক

 

 

কলিকাতা হারবাল

বিজ্ঞান বলেছিলো
রাতটা আর জাগবে না
প্রেমিকার বায়না ছিলো
যতদূর সম্ভব দীর্ঘ হোক
আহ! ঘুম পালানো রাত!

কিন্তু হায়!
পুব আকাশে সূর্যের চোখ লাল
আহ! কলিকাতা হারবাল।

 

 

কিরণ আকরামুল হক
কবি
জন্ম- ১৩ নভেম্বর, কুষ্টিয়া
প্রকাশিত  কবিতার বই-
স্বপ্নবুনি
বাংলা তানকা( যৌথ) 
অহেতুক মানুষ 

Spread the love
  • 53
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    53
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন