অনন্য বাবা ।। অনন্যা গোস্বামী

আমার না ছোটবেলায় মানে এই কৈশোর পর্যন্তও বাবার ওপর খুব রাগ হতো। সে আমার জন্য কখনোই তেমন বাবা ছিল না যেমনটা আমার আশেপাশের অন্যদের বাবারা ছিল।

বাবা খুব সকালে আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতো মাছের ঘাটে। তার সখাসকল বলতো, “অরে হাঁটাইতাছস কেন? কোলে নে।” বাবা বলতো, “আরে নাহ, আমার মাইয়া না? একলাই হাঁটতে পারব।” আমি ভাবতাম আঙ্কেলরা তো ঠিকই বলছে। বাবা তো আমাকে কোলে বা কাঁধে চড়াতেই পারে। এতো হাঁটতে আমার কষ্ট হয় না বুঝি? আঙ্কেলরা আমাকে চকলেট কিনে দিতে চাইলে বাবা নিষেধ করতো। আমি গাল ফোলাতাম। লোকটা সবার সাথে আমাকে নিয়ে বোস কেবিনে যেত। লেবু দেয়া কম চিনির হালকা লাল চা আর বোস কেবিনের ঐতিহ্য মাছের কাটলেট খাওয়াতো। বাবা একটু একটু করে পিরিচে ঢেলে দুটো ঠোঁটের দরজা সামান্য খুলে চায়ে চুমুক দিত। সিগারেটের ঠোঁটে সে কোনোদিনই ঠোঁট ছোঁয়ায়নি। দুই আঙুলে সিগারেটের শরীরটাকে আলতো করে চেপে ধরে বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর গহ্বরে মুখ রেখে ধোঁয়া টানত। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। সেই দৃশ্য আজও আমার কাছে পুরুষের প্রতি প্রথম মুগ্ধতা।

বাবা এবং তার বৃত্তের প্রায় সবাই বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল বলে তাদের চাড্ডার পুরোটা সময় ওসব নিয়েই কথা হতো। আমি শুধুই শুনতাম। বুঝতাম না ঘন্টাটাও। তবে আমার আগ্রহ ছিল দুর্বার। অপেক্ষা … কবে বড় হবো। পোস্টার লিখবো, মিছিলে যাব, শ্লোগান দেব।
একটু বড় হবার পর কাকুরা বলেছিল, “অরেও সংগঠনের কামে দিয়া দে।”
আমি তো পুরাই ঢিঙ্কা চিকা। কিন্তু আমার বাবা… “না, পড়াশুনা করুক আগে। ওসব পরে দেখা যাইব।”
উফফফ অসহ্য।

রোজ সকালে বাবা আর মা চা খাওয়ার সময় আমাকেও বসতে হতো তাদের সাথে। হরলিক্স-ফরলিক্স না। একটুখানি হলেও চা আমাকে খেতেই হতো। মা রাগ করতো খুব। এইটুকু মেয়েকে চা খাওয়ানোর কী দরকার আছে? ভদ্রলোক বলতেন, “আছে, অনেক দরকার আছে।”

তারপর নিয়ম করে রোজ আমাকে ব্যাঙ্ক থেকে আনা কচকচে নোটের বান্ডিল থেকে দুই টাকার নোট দিত সে। মাঝে মাঝে পাঁচ টাকার নোটও দিত। বলতো, “পুচু, কতো হইলো?” আমি হাতের কড় গুনে বলতাম। ভুল হলে বাবা শুধরে দিত। মা তো ব্যাপক নাখোশ। এইটুকু বয়সে মেয়েকে টাকা শেখানো হচ্ছে? বাবা বলতো, “শিখুক। টাকা শিখতে হইবো না?” বাবা অনেক বেশি বেশি টাকা আমার হাতে দিত। আবার নিয়েও নিত। বলতো, “তোমারই তো টাকা। আমার কাছে জমা থাক?” মনে মনে বেজার হলেও মুখে বলতাম, “আচ্ছা।”

লেখকঃ অনন্যা গোস্বামী, বাচিক শিল্পী

বৃষ্টি, ঝড়, ভূমিকম্পেও অত্যাচারী লোকটা আমাকে জোর করো স্কুলে পাঠাতো। একটা মাসিক রিক্সা ঠিক করাই ছিল আমার জন্য। কাজের লোক না থাকলেও স্কুলে না যাবার কোনো বাহানা বানানোর সুযোগ ছিল না। একা হলেও যেতে হতো। আমার জামা, জুতা, মোজা সব নিজেকেই পরতে হতো। ব্যাগও নিজেই গোছাতাম। এক বছরে একটার বেশি ব্যাগ আমাকে কিনে দেয়া হতো না। তাও অতি সাধারণ মানের। রঙচঙহীন।

লোকটা কোনো জন্মদিনে আমাকে পুতুল, খেলনা, হাঁড়িপাতিল কিছুই কিনে দিত না। জন্মদিনের অনুষ্ঠানই করতো না। রাতের বেলা বাসায় ফিরতো ঠিক দুইটা বই নিয়ে। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, লীলা মজুমদার, সুকুমার রায়, প্রমথ চৌধুরী।
বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলের পর আমার সহপাঠীরা পেত সোনার চেইন, রিমোটওয়ালা খেলনা। আমাকে নিয়ে যাওয়া হতো বিদ্যাসাগরে। বইয়ের দোকান। সীমাহীন বাজেট। যা খুশি কেনো। জলরঙের প্লেট, ডিসেকটিঙ বক্স, তুলি, মোমরঙ…. ইত্যাদি।
দোকানের রশিদটা ভালোমতো সংরক্ষণের দায়িত্বও ছিল আমার।

সেসময় আমরা প্রায় সবাই কাঠের স্কেল ব্যবহার করতাম। দাম ছিল দুই টাকা। ভেঙে গেলে বা হারিয়ে ফেললে বাবা খুব রাগ করতো। মা বলতো, “দুইটা টাকার জন্য তুমি এমন করছ?” বাবা বলতো, “বিষয়টা দুই টাকার না।” আমি বুঝে উঠতে পারতাম না বিষয়টা তাহলে কী।

বাবা আর মা দুজনই দুই হাতে সমান তালে অর্থ উপার্জন করেছে। কখনো কিছু চাইতে হয়নি আমাকে। সবকিছু হাজির হয়েছে চোখের পলকেই। তবু সবকিছুর মাঝেও খুব সন্তর্পণে জেনেছি জীবনের মানে কী।

সর্দি-কাশিতে ওষুধ খেতে দিত না বাবা। মাকে বলতো, “টক খাওয়াও।”একবার চোখের সমস্যার কারণে ডাক্তার আমাকে চশমা ব্যবহার করতে দিল। আমার খুশি আর ধরে না। অথচ খবিশ লোকটা বললো, “কীসের চশমা? লালশাক খাও।” শুরু হলো মলা-ঢেলা মাছের উৎপাত। প্রাথমিক আর জুনিয়র বৃত্তির বছরে মানুষটা আমার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে। ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে টেনে তুলে পড়তে বসাতো। তাও আবার শীতের সময়। এসএসসির পর তার এক কথা। ভিকারুন্নিসা বা হলিক্রসে চান্স পেতেই হবে। দুই জায়গাতেই লিখিত পরীক্ষায় উৎড়ে গেলেও হলিক্রসে ভাইবাতে টিকলাম না। চরম আকারে জ্বর এলো। টাইফয়েড। মাথার চুল ফেলে দিলাম। মুক্তি মিললো না। ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে ভিকারুন্নিসাতে ভাইবা দিতে গেলাম। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। ভাইবাও দিলাম। সে যাত্রায় রক্ষা পেলাম।

এবার সকলে বললো “প্রতিদিন কে ওকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় নিয়ে যাবে?” বাবা বললো, “অয় একাই যাইব।”
আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “পারবা না বাবা?” আমি বললাম, “পারব না ক্যান বাবা? আমি তোমার মাইয়া না?”

সেই যে বাবা খাঁচার দরজা খুলে দিল, এতোদিন ধরে প্রশিক্ষণ দেয়া পাখিকে উড়িয়ে দিল, আর কখনো এই পাখিকে দানা-পানি, আশ্রয় কোনোকিছুর জন্য কোত্থাও গোত্তা খেতে হয়নি।

এখন আমি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত ওষুধ না খেয়েও জ্বর কাটিয়ে দিতে পারি। এখন আমি প্রত্যাশা করি না আমার ভালোমন্দের কেউ খোঁজ করুক বা মাঝরাতে কেউ কপালে হাত রাখুক। এখন আমি অবলীলায় বিশ টাকা দিয়ে দিন কাটিয়ে দিতে পারি। শুধু চা আর রুটি খেয়ে পার করতে পারি একটা দিন।

আমি জানি, আমার বাবার আদিখ্যেতা নেই। কিন্তু আমার বাবার শক্তি আছে।

আমার বাবা জানত, সে জগতের কারো সাথে আঁতাত করে তার মেয়ের জন্য অঢেল সুখ গচ্ছিত রাখবে না। তাই সে তার মেয়েকে পৃথিবীর সবকিছুর সাথে হাত মিলিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছে। টিকে থাকতে শিখিয়েছে। অভিযোজিত হতে শিখিয়েছে।

আমি আজ বুঝি, আমি বড় হতে চাইনি, সফল হতে চাইনি, আমি আমার বাবা হতে চেয়েছি।

Spread the love
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    27
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন