দাম্পত্য জীবনে সুখে থাকার উপায়

আধুনিক শিল্প সমাজের পরিবারে পারিবারিক ভাঙন, দাম্পত্য কলহ, নির্যাতনসহ নানা ধরনের জটিল সমস্যা দেখা যায়। এইসকল সমস্যা দিনে দিনে জটিল হয়ে যাচ্ছে, কারণ মানুষ হয়ে যাচ্ছে অনেকটাই যান্ত্রিক এবং কমে যাচ্ছে আদর, বন্ধন, ভালোবাসা, সহানুভূতি।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে ‘সম্পর্ক’ বিশেষজ্ঞ টি তাশিরো বলেছেন, টাকা-পয়সা, সৌন্দর্য বিবাহিত জীবনকে সুখী করতে পারে না। অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। তাঁর মতে, একটি ভালোবাসাময় সুখী বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সবার মধ্যে যে গুণটি থাকা প্রয়োজন, তা হলো—আন্তরিকতা। আন্তরিক বলতে তিনি এমন কাউকে বুঝিয়েছেন, যিনি হবেন বিনীত, নমনীয়, বিশ্বাসযোগ্য, ভালো স্বভাব, সহযোগী মনোভাবাপন্ন, ক্ষমাশীল, উদার ও ধৈর্যশীল।

অন্য আরেক দল গবেষক মনে করে, ভালোবাসাই একজন নারী ও একজন পুরুষের মাঝে হৃদয়ের অটুট বন্ধন তৈরি করে দেয়। তৈরি করে সাংসারিক বন্ধন। ভালোবাসা ব্যতীত কোনো সাংসারিক কিংবা দাম্পত্য জীবন সুখের হয় না। স্বামী ও স্ত্রী একে অন্যের পরিপূরক। একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজন শূন্য, ফাঁকা।

আসুন জেনে নেই দাম্পত্য জীবনে সুখে থাকার কিছু উপায়-

একে অপরের বন্ধু হবার চেষ্টা করুন

দাম্পত্য জীবনের শুরুতেই দুজন মানুষের মধ্যে বন্ধুভাবাপন্ন মানসিকতা তৈরি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন বন্ধু আপনাকে যতটা ভাল বুঝতে পারবে সেটা অন্যকেউ বুঝতে পারবেনা। আর একজন বন্ধুর কাছেই মানুষ তার ভালোলাগা, মন্দলাগা, ভয়, অভিমান, প্রত্যাশার কথা, সমস্যার কথা নির্দ্বিধায় শেয়ার করতে পারে।

 

 

 

বিশ্বস্ততা

সুখী সংসার গঠনের পূর্বতম শর্ত হলো বিশ্বস্ততা। বিশ্বাসহীন সংসার টিকে থাকা দুরূহ। বছরের পর বছর একই ছাদের নিচে বসবাস করার পরও দেখাযায় দুজনার মধ্যে প্রচুর বিশ্বস্ততার অভাব রয়েছে। কিন্তু তারা সংসার করছে কেবল সমমানহানি হবে বলে এবং বিশৃঙ্খলার ভয়ে অথবা ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথাচিন্তা করে। সুখী দাম্পত্য জীবন চাইলে দুজনার মধ্যে বিশ্বস্ততা বাড়াতে হবে, অবিশ্বাসের মূল উঠিয়ে ফেলতে হবে, তথাপি অবিশ্বাসের বিষয়টি দুজনই আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করতে হবে।

 

 

মনের মিল

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মনের মিল। মনের মিল না থাকলে সংসার জীবনে সুখী হওয়া যায় না। আর সবসময় মনের মিল না-ও হতে পারে। তাই বলে অন্য কারও তুলনা টেনে আনবেন না। এতে হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারেন সঙ্গী। যে কোনো সমস্যায় দুজনে খোলাখুলি কথা বলুন। পরস্পরের পছন্দ–অপছন্দও জেনে নিন এবং গুরুত্ব দিন দেখবেন সুখেই কাটছে সংসার।

 

 

সঙ্গীকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা

দাম্পত্য জীবনে বর্তমানে যে সমস্যা টি বেশি দেখা যায় তা হলো সম্মানের অভাব। যার কারনে সৃষ্টি হয় মতভেদ। আর তা বাড়তে বাড়তে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াতে দেখা যায়। স্বামী স্ত্রী দুজনেরই উচিৎ একে অপরকে মানুষ বা বন্ধু হিসেবে শ্রদ্ধা করা। শ্রদ্ধাবোধ যে কোন সম্পর্ককে আরও নতুন মাত্রা দেয়। কখনো এমন কোন কথা বলবেন না বা কাজ করবেন না যা অন্য ব্যক্তি মানুষটার আত্মসম্মানে আঘাত করে। প্রত্যেক মানুষেরই নিজের কাছে তার আত্মসম্মান বোধ রয়েছে।

 

 

সঙ্গীর পছন্দকেও গুরুত্ব দিন

স্বামী বা স্ত্রী দুজন দুজনের পছন্দের গুরুত্ব দিন। সব সময় নিজেকে নিয়ে ভাববেন না। ব্যস্ত থাকলেও, কাজের মধ্যে সময় বের করে খবর নিন। ভালোবাসা যেন শরীরসর্বস্ব না হয়। বরং মন জয় করুন।

 

 

বিশেষ দিনে উপহার

বিশেষ দিন যেমন, বিবাহবার্ষিকী, জন্মদিন। এই দিন গুলোতে বিশেষ আয়োজন রাখতে পারেন। এছাড়া উভয়ে নিজেদের উপাহার দিতে পারেন। এত সংসার হবে আনন্দময়।

 

জোর করবেন না

আপনার স্ত্রীকে শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় জোর করবেন না বা কোনো কিছু চাপিয়ে দেবেন না। অনেকেই মুখ ফুটে নিজের চাহিদার কথা বলতে পারেন না। ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলুন। বুঝে নিন ঠিক কী চান তিনি।

 

সপ্তাহে একদিন ঘুরতে যান

দাম্পত্য জীবনে সুখে থাকার অন্য আরেকটি উপায় হচ্ছে ঘুরে বেড়ানো। কারণ সারা সপ্তাহ কাজ করে মন ও শরীর ঠিক রাখতে এবং রোমাঞ্চ করেত সঙ্গীর সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে পারেন। একসঙ্গে কোথাও যাওয়ার হলে, বারবার দেরি করার অভ্যাস ছাড়ুন। এতে তিক্ততা তৈরি হয়।

 

ভুল স্বীকার করার মানসিকতা রাখুন

মানুষ মাত্রই ভুল হবে। সেটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। এমন কখনো মাথায় গেঁথে রাখবেন না যে, আমি কখনো ভুল করতে পারি না। ভুল বোঝাবুঝির দেয়াল বাড়তে দেবেন না। নিজের ভুল বুঝতে পারার সাথে সাথেই তা স্বীকার করে ফেলুন এবং দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলুন।

 

সন্দেহ নামক ক্যান্সার কে ছড়াতে দেবেন না

সন্দেহ ক্যান্সার থেকেও ভয়ানক রোগ। যা একবার মন কে গ্রাস করলে যে কোন সুন্দর কোনকিছু কে মুহূর্তেই ধুধু মরুভূমি করে দিতে পারে। সন্দেহ নামক শব্দ টিকে সিলগালা করে রাখার চেষ্টা করুন। আর যদি সন্দেহ জীবনে প্রবেশ করেই ফেলে তবে চেষ্টা করুন সন্দেহের বিষয় নিয়ে কথা বলার মধ্যে সেটি যত দ্রুত সম্ভব দূর করার চেষ্টা করুন। সন্দেহ কে জিয়িয়ে রাখবেন না।

 

 

হঠাৎ পরিবর্তন

জোর করে কিছু পাল্টে ফেলার চেষ্টা করবেন না। আরোপিত কোনও কিছুই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এতে করে সংসারের শান্তি নষ্ট হয়। তাই সবকিছুর মধ্যে সংযত ভাব আনুন।

 

 

পারস্পরিক সম্প্রীতি

খ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েড মনে করেন, পিতা-মাতার কলহ শিশুর যৌন ও সংসার জীবনের প্রতি অনীহা দেখা যায় এবং বিকাশে বাধা প্রদান করে। তাই দুজনকে শিশুর স্বার্থেই সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে।

 

উপরোক্ত বিষয়গুলোর মূল কথা হলো কম্প্রোমাইজ। দুজনের বোঝাপড়ার মাধ্যমেই সুখী সংসার গঠন করা সম্ভব হয়। অন্যথায় দুজনকেই তুষের আগুনে চিরকাল জ্বলতে হয়।

 

Spread the love
  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন