সিনেমার মুক্তি অথবা কন্যা বিদায়ঃ আহত ফুলের গল্প

।।অন্ত আজাদ।। 

জন্মটাই ব্যাথার.. কেন জন্ম নেয়.. কেন ব্যাথা দেয়! অজান্তেই জন্ম নেয় সৃষ্টির রহস্যময় ভ্রুণ। আমার হৃদয়ে জন্ম নেয় আমার অনুমুতি ছাড়াই! কে আমি..আমি কে..? ভ্রুনের আকার বাড়ে, বাড়ে দায়িত্ব.. বাড়ে ব্যাথা.. বাড়ে যন্ত্রনা- আহা সিনেমা!

সেই ১৪/১৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা.. আগুন-বোমার দিনগুলোতে যখন অসহায় আমরা! অনেক কষ্ট আর পরিশ্রমে ফুটপাত থেকে সংগ্রহ করা পুরোনো বইগুলো সে সময় বিক্রি করে যখন নিত্য বেঁচে থাকার ব্যাকরণ রচনা করছি, তখন অন্যদিকে মস্তিষ্ক আর হৃদয়ের সংঘর্ষে জন্ম নিচ্ছে ‘আহত ফুলের গল্প’ সিনেমার কাহিনী ও চিত্রনাট্য। তারও একবছর আগ থেকেও চলেছে বিষয়বস্তুর উপর গবেষণা। সবকিছু পেরিয়ে একদিন চিত্রনাট্য পৌছালো তার সমাপ্তি বিন্দুতে।

ঘষামাজার মাঝেই প্রতি মুহুর্তে ভ্রুনটি তার জন্মানোর আকুতি জানান দিচ্ছে। অসহায় আমি হৃদয়ে অসহ্য যন্ত্রনা সহ্য করে তারদিকে তাকাই ঘুরিফিরি তাকে জন্মদানের উপায় খুঁজি। এরমধ্যে বন্ধু হাবিব এর প্রস্তাবে জীবনের প্রথম চাকরি শুরু করলাম টিম ইয়োলোতে- বেঁচে থাকার তাগিদেই। প্রায় দু-বছর যুক্ত ছিলাম সেখানে। স্বাধীন ধারার সিনেমায় আমাদের এখানে টাকা ঢালার মতো তেমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না, তাই তার দায় নিতে হয় নিজেকেই। মূলত ধারদেনা, চাকরী থেকে পাওয়া কিছু কিছু টাকা এবং গ্রামে মা’র মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প থেকে কিছু ঋণ গ্রহন করি। এভাবেই ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় ‘আহত ফুলের গল্প’ সিনেমার শুটিং।

এর আগে সেট নির্মাণ করতে গিয়ে নানান প্রতিবন্ধকতা, কস্টিউম তৈরী, অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে রিহার্সেল, টেকনিক্যাল টিমের সাথে মিটিং চলে প্রায় ২/৩ মাসের মতো। পঞ্চগড় জেলার দেবীঞ্জ থানায় হয় সিনেমার ৮০% শুট। এর ১ বছর পর বাকি শুট শেষ করি। এরপর সম্পাদনা, ডাবিং, মিউজিক, শব্দ মিশ্রন, কালার, পরিচালক সমিতির সদস্যপদ সংগ্রহ, প্রযোজক সমিতির সদস্য হওয়া, সেন্সর সার্টিফিকেট লাভ করতে লেগে যায় প্রায় ২ বছর ৬ মাসের মতো সময়। মা বলতো- ‘ফাঁকি দিলে ফাঁকিতে পড়বি’। সেই উপদেশ মেনে কাজটি শেষ করতে ফাঁকি দিইনি কোথাও। তাই নির্দিষ্ট কাজে সঠিক মানুষটির সংযোজন এবং তাদের সাথে সময় দিয়ে কাজটি মান সম্মতভাবে বের করে আনতে সময় চলে যায় বেশ খানিকটা।

তারপর সিনেমার মুক্তি। মুক্তি আসলে মুক্তি নয়, এ আসলে পরবর্তী যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বের শুরু মাত্র। কারণ এ ধরণের স্বাধীন  ধারার সিনেমায় যেহেতু তেমন স্টার কাষ্ট থাকেনা, সে কারণে সিনেমা হলে মুক্তি দিতে গিয়ে পড়তে হয়ে অনেক বাধার মুখে। সেই বাধার মুখে পড়েছেন আমাদের অনেক অগ্রজই। বাজারে প্রচলিত আছে এ ধরণের সিনেমা মানুষ দেখতে চায়না! প্রচলিত এ বিষয়গুলোকে আমার একটু নিজস্ব অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে বোঝাপড়া করবার ইচ্ছে আছে। মূলত সে ইচ্ছে থেকেই আমি আমার সিনেমার প্রদর্শনভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছি।

সবকিছু শেষে সিনেমা যখন মানুষকে দেখাতে যাবো, তখন অদ্ভূদ এক বেদনায় মন আক্রান্ত হয় প্রতিনিয়ত! এতদিন সিনেমাটা ছিল একান্ত আমার, মুক্তির পর থেকে সবার। যেন আগের মতো তার উপর আর অধিকার খাটাতে পারবোনা। কোথাও এই অধিকারটুকু ছাড়তে গিয়ে যেন ব্যথা অনুভব করি, চোখের কোনে জল আসে! যেন কন্যাকে লালন পালন করে বিয়ে-বিদায় দেয়ার মুহূর্তের বেদনা! কত মায়া.. কত ব্যাথা.. সিনেমা!

 

বাস্তবতাকে মানতেই হয়, এরকম অসংখ্য নির্মম বাস্তবতার মধ্যদিয়ে হেঁটে এগোতে হয় একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে। তারই প্রথম ধাপ সফলভাবে পার করলাম পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ থানায় ঈদুল আযহার দিন থেকে টানা ১৪ দিনের দর্শক আনুকূল্য পাওয়া সফল প্রদর্শনীর মধ্যদিয়ে। কালাম ভাই, ছিলেন আমাদের ওখানকার সিনেমার মাইকিং করার জনপ্রিয় একজন মানুষ। তিনি মাইকিং করা ছেড়ে দিয়েছেন প্রায় ৭ বছর আগে। তার বাড়ি গিয়ে তাকে খুঁজে বের করলাম। তিনি কোনভাবেই আর সিনেমার মাইকিং করবেন না! আমি ওনাকে জোড় করায় অন্য মানুষ ম্যানেজ করে দিতে চাইলেন। এরপর অনেক অনুরোধ করায় তিনি একবার আমার সিনেমা দেখতে রাজি হলেন। সিনেমা দেখে উনি পুরোপুরি কনভিন্স, আর কোন সিনেমার মাইকিং না করলেও আমাদের সিনেমার মাইকিং তিনি করবেন- কথা দিলেন। এরপর শুধু তিনি মাইকিংই করলেন না, যে দর্শক টিকেট কাউন্টারের সামনে এসে সিনেমা দেখবেন কিনা দ্বিধায় ভোগেন, তাদরে প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। সিনেমা ভালো না লাগলে তিনি টিকেট এর টাকা ফেরত দেবেন! দর্শক ওনার কথায় সিনেমা দেখতে ঢোকে। বের হয় তৃপ্তি নিয়ে, আমার সাথে ছবি তোলে কেউ কেউ। কেউ নিজেকে প্রকাশের ভাষা খুঁজে না পেয়ে আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে চলে যান।

দর্শকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমান উপস্তিতি ছিল মহিলা দর্শকের। কোন বাড়ির কর্তা সিনেমা দেখার পর, তার পুরো পরিবারকে নিয়ে এসেছেন সিনেমা দেখতে! কোন ভাই সিনেমা ভালো লাগার পর তার বোনকে নিয়ে এসেছেন সিনেমা দেখতে! এগুলোই এখন পর্যন্ত আমাদের সিনেমার ছোট ছোট অর্জন। এছাড়া পঞ্চগড়-২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব নুরুল ইসলাম সুজন এর কাছ থেকে সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ সম্মাননা স্মারক গ্রহন করার বিষয়টিও অনুপ্রাণিত করেছে নিসন্দেহে। প্রদর্শনী শুরুর আগে ওখানকার অনেক মানুষের প্রশ্ন ছিল সিনেমা নেট এ আসবে কবে? আমি বলি- তাতো জানিনা, তবে ঈদ থেকে দেখতে পাবেন ‘আমার টকিজ’ এর বড় পর্দায়। অনেকে চোখ বড় বড় করে তাকায়! তাদের প্রশ্ন- সিনেমা হলতো বন্ধ। আমি জানাই হল আবার খুলছি। তাদের চোখমুখে ভেসে ওঠে অনেক আগের সিনেমা হলে সিনেমা দেখার স্মৃতি! এরপর তারা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার নানান স্মৃতি রোমন্থন করতে থাকে। সেখানকার অধিকাংশ মানুষ সর্বশেষ বড় পর্দায় সিনেমা দেখেছে প্রায় ৪/৫ বছর আগে। যখন ‘আমার টকিজ’ হলটি খোলা ছিল। সে সময় শেষের দিকে এক একটি শো’য়ে দর্শক হতো ৪/৫ জন! এ পর্যায়ে এসে হলটি বন্ধ হয়ে যায়! সে মানুষগুলোই যখন আমার সিনেমা দেখা শেষে সিনেমার বিষয়বস্তু, হলের পরিবেশ ইত্যাদি নিয়ে তাদের তৃপ্তির কথা জানায়, তখন সৃষ্টির সার্থকতা খুঁজে পাই। আরো গভীরে ভাবি, অনেক বড় দায়িত্ব অনুভূত হয়।

অন্ত আজাদ, কাহিনীকার ও পরিচালক

আমার সিনেমায় ছোট-বড় কার কতটুকু ভূমিকা সে বিষয়ে আমার হৃদয় সম্পূর্ণ অবগত আছে। ‘আহত ফুলের গল্প’ সিনেমাকে ভালোবেসে যারা আমার নেতৃত্বে জাহাজে সঙ্গী হয়ে উত্তাল সমুদ্রে যাত্রা শুরু করেছেন, তারা ভরসার জায়গাটা শেষ পর্যন্ত রাখবেন আশা করি। জার্নিটা এখনো শেষ হয় নাই। আপনাদের সকলকে আমি সুন্দর গন্তব্যে পৌছে দেবো, সকলের মুখে হাসি ফুটিয়েই আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নতুন কোন বন্দরের উদ্যেশ্যে আবার অনিশ্চিত যাত্রা শুরু করবো। আমি কমিটেড আছি- আমার দায়িত্বের প্রতি, সিনেমার প্রতি। যেহেতু এই সিনেমায় বড় ধরণের কোন পূজির সংযোজন ঘটেনি, সেহেতু এখানকার সবকিছু একটু  স্লো মোশনে চলবে। এটা সকলকে মেনে নিতে হবে। কারণ এটাই বাস্তবতা। যেহেতু এই স্বপ্ন আমার হৃদয় গর্ভে আমি স্বেচ্ছায় ধারণ করেছি, সেহেতু এটার দায় সম্পূর্ণ আমার, একান্তই আমার একার। এই দায় প্রতি মুহুর্তে আমি অনুভব করি এবং সর্বদা সব ধরণের সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় রত আছি… সিনেমাটার সঙ্গে থাকুন.. সকলের জন্য শুভকামনা…

পরিচালকের সাক্ষাতকারঃ 

"আহত ফুলের গল্প" সিনেমা নিয়ে কিছু কথা…

Posted by Anto Azad on Wednesday, August 22, 2018

Spread the love
  • 266
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    266
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন