লালনের গানের খাতা

।।সিনা হাসান।।

শুরুতেই পরিস্কার ভাবে বলা উচিত একটা বিষয়, লালন বলেছেন- “সিনার ভেদ সিনায় সিনায়, সফিনার ভেদ সফিনায়”, মানে হৃদয়ের রহস্য হৃদয় জানে, গ্রন্থ জানে গ্রন্থের। গ্রন্থ দিয়ে হৃদয়কে বোঝা যায়না। গান আর গানের খাতায় লক্ষ- যোজন ফারাক। লালন ফকির লিখিত শাস্ত্রের চর্চা করতেন না বরং যা লেখা তা মনের ভেতর ধারণ করা আছে কিনা, মানুষ নিছক লেখা না পড়ে বাস্তবে তার অন্তর্নিহিত বক্তব্যের চর্চা করছে কিনা তাই নিয়েই আজীবন বলেছেন। তবুও, কেউ কেউ তার বানীগুলো বা গান/ জ্ঞানগুলো (বাউল ফকিররা গানকে জ্ঞান বলেন) লিখে রাখতেন, যদিও তাতে বানান ভুল, হাতের লেখা খারাপ! না হয় লালন লেখাপড়া জানতেন না, জানলেও তা কখনো বলেননি, একটা হরফও লিখেন নাই জীবনে, কিন্তু খাতাগুলো তার থেকে সরাসরি শুনে শুনে তো লেখা! তা ডকুমেন্ট হিসেবে আজ কতোই না গুরুত্বপূর্ণ। তার গান লিখে রাখতেন মূলত তার ভক্ত পন্ডিত মনিরুদ্দিন শাহ্। এ ছাড়াও ভোলাই শাহ্, শীতল শাহও লিখে রেখেছিলেন কিছু। কিন্তু সেগুলো কোথায়? তা খুঁজতে গিয়ে কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছিলো, সেগুলো একটু আপনাদের সাথে ভাগ করে নেবার জন্যই এ লেখা।

ক) প্রথমেই একটু ইতিহাসে যাই, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ এ লিখেছেন- ‘১৯২৫ সালে ঐ অঞ্চলের বিখ্যাত লালনশাহী মতের ফকির হীরু শাহ্ সঙ্গে বাড়ি হইতে দশ মাইল হাঁটিয়া লালনের ছেউড়িয়া আখড়ায় উপস্থিত হই।…. ঐ সময়ে আশ্রমে রক্ষিত একখানা পুরানো গানের খাতা দেখি। উহা নানা প্রকারের ভুলে এমন ভর্তি যে, প্রকৃত পাঠোদ্ধার করা বহু বিবেচনা ও সময় সাপেক্ষ। আশ্রেমের কর্তৃপক্ষরা বলেন সাঁইজীর আসল খাতা শিলাইদহের ‘রবিবাবু মহাশয়’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) লইয়া গিয়াছেন’।

হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! কিন্তু লালনের গানের খাতার গল্পে তিনি কী করে এলেন?

শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র ভবনে ছিলো লালনগীতির দুটি পুরাতন খাতা। দুটিরই উপরে পেন্সিল দিয়ে লেখা আছে- ‘Songs of Lalon Fakir, Collected by Raindranath’। মোট গানের সংখ্যা ২৮০। রবীন্দ্রনাথ যখন কুষ্টিয়ায় শিলাইদহের জমিদারীর পারিবারিক দ্বায়িত্ব নিয়ে যান ১৮৯০ সালে, তখন তিনি লালন ফকিরের নাম শুনতে পান। রবি বাবু কখনো লালনের আখড়ায় যাননি, এবং লালনও ততোদিনে ১৮৮৯ সালে ভবলীলা সাঙ্গ করেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এর ভবলীলা তখন তুঙ্গে, ভরা যৌবনে, গীতাঞ্জলীতে হাত দিয়েছেন কেবল। মানুষের কাছে বাউল ফকির লালনের কথা ও গান শুনে বরিবাবু তার এস্টেটের কর্মচারী বামাচরণ ভট্টাচার্য্যকে পাঠান লালন এর আখড়ায়, যেন বাউলের খাতা পেলে তা কপি করার কথা বলে সাথে করে নিয়ে আসে।

  হোসেন শাহ্ (২০১২)

বামাচরণ জমিদারের লোক, সহজেই দুটি খাতা নিয়ে এলেন, তা ছিলো ভোলাই শাহ্ এর হস্তে লিখিত। ভোলাই শাহ্ এর লিখিত তা বুঝবার কারণ হলো- ভোলাই শাহ্ লিখতেন খাতার উল্টোদিক থেকে, আরবী কায়দায় এবং অন্যদিকে তিনি বানানে অনেক ভুল করতেন, যার দুটি কারণই ঐ নিকেতনে খুঁজে পাওয়া খাতা দুটির সাথে মিলে যায়, এই গবেষনার ক্রেডিট শ্রদ্ধেয় গবেষক সুধীর চক্রবর্তীর। তো বরিবাবু খাতা দুটো আলালের বটে! আনিয়ে তা কপি আর করাননি, ফেরতও দেন নাই, এই গাফিলতি একজন শিল্পী + সাহিত্যিকের জমিদারী দর্পণের সাইড ইফেক্টসও হতে পারে। আর শিল্পীমনে কিছু ভুলোমনা আচরণও থাকে বলে আমরা জানি তাই বরিবাবুকে ‘চোর’ বলা যায়না। সেই খাতা দুটিই ৫০ এর দশকে খুঁজে পাওয়া যায় শান্তিনিকেতনের স্টোররুমে, গাদাঠাসা কাগজের স্তুপে। শক্তিনাথ ঝাঁ নিকেতনের রবীন্দ্র ভবনে এ দুটি ছাড়াও আরো একটি খাতা খুঁজে পেয়েছেন। তবে তা সেই আসল খাতা কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।উল্লেখ্য যে ঐ একই সময়ে লালনের প্রতিকৃতি বলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের (রবি ঠাকুরের বড় ভাই, শিলাইদহের রবীন্দ্রপুর্ব জমিদার) আঁকা ছবিটাও খুঁজে পাওয়া যায়, আমার ধারণা সে ছবি আসলে লালনের নয়, তা ছিলো মনগড়া, তা আমি অন্য লেখায় বর্ণনা করবো, সাথে জমিদার বাড়ীর সাথে লালনকে নিয়ে জনশ্রুতিগুলো আমার প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে খন্ডনের চেষ্টা করবো।

ফকির মন্টু শাহ্ তার ‘লালন- সঙ্গীত’ বইয়ে আরেকটি খাতার উল্লেখ করেন- ‘ভোলাই শাহের ভক্ত জহররুদ্দিন শাহের অছিয়ত (নির্দেশনা) অনুসারে বর্ধমানের মধুবন গ্রামে তার কবরে তাঁর দেহের সাথে লালনের গানের খাতা পুঁতে দেয়া হয়।’

খুব বেশী গানের ডকুমেন্টেশন হয়নী, যাও হয়েছিলো তা এরকম কোনটা কোথায় গেছে তার হদীস মেলা ভার।

খ) ইতিহাস ঘেঁটে তারপর নামলাম মাঠে, ঘুরেফিরে আমি আরো একটি খাতার কথা আমি জানতে পারি, তা রক্ষিত ছিলো ‘ইব্রাহিম শাহ্’ এর কাছে। সেটায় পন্ডিত মনিরুদ্দিন শাহ্ লিখে রাখতেন গানগুলো সরাসরি লালনের মুখে শুনে শুনে। উল্লেখ্য এই মনিরুদ্দিন শাহ্ প্রথমে লালনের সাথে তর্ক করতে গেলে লালনের কথা শুনে তার ভক্ত হয়ে যান এবং লালনের অন্যতম প্রধান শিষ্য হয়ে ওঠেন। তো এই মনিরুদ্দিন ফকিরের শিষ্য ছিলেন মঙ্গল ফকির, তার শিষ্য মহিম ফকির, তার শিষ্য বাবুল রহমান ফকির, তার শিষ্য ইব্রাহিম শাহ্ ফকির, যিনি গুরু শিষ্য পরম্পরায় সেই খাতাখানা পান, এবং যখন মুত্যুবরণ করেন তখন তাঁর ছেলে ‘হোসেন শাহ্’ শাহ্ নাবালক।

আমি হোসেন শাহ্ কে জীবিত পেয়েছি এবং কুষ্টিয়া রেলস্টশনের পিছনে ওনার বাড়ী গিয়ে ইন্টারভিউ করেছি। খাতা নিয়ে তার গল্পটা এরকম- ১৯৬০ এর দশক। ইব্রাহিম শাহ্ এর মৃত্যুর পর ছেলে হোসেন সেই খাতাটি তখন আগলে রাখতে চায় এবং মা’কে বলে যে ‘এ খাতা কাউকে দিও না’। তখন ছেঁউরিয়ার অদূরে কুষ্টিয়ার লাহিনী বটতলায় তাঁদের নিবাস ছিলো। কিন্তু পরদিন রাতে ঐ এলাকারই ‘মোশাররফ ফকির’ ওরফে ‘মশা ফকির’ নামে একজন এসে হোসেন শাহ্ এর মাকে বলে যে ঐ খাতাটা ইব্রাহিম শাহ্ তাঁকেই দিয়ে যেতে চেয়েছিলো মৃত্যুর আগে। তিনি তিনশ টাকা বের করে বলেন ‘ভাবী এটা রাখেন, আর খাতাটা দেন, আমি তিনদিন পরই কপি করে ফেরত দিয়ে যাচ্ছি’। কিছুক্ষণ কথা বলায় হোসেন শাহ্’র মা সম্মত হন এবং টাকা ৩০০ রেখে সিন্দুক থেকে খাতাটা বের করে হোসেন শাহ্কে বলেন সেটা মশা ফকিরকে দিতে। হোসেন শাহ্ তখন তখন কোন কথা বলেননি, মায়ের উপর অভিমান হচ্ছিলো তার। হোসেন শাহ্ বলেন- ‘লাল বাঁধাই করা, এই মোটা খাতা’ (আঙুল দিয়ে খাতার সাইজ দেখিয়ে)। কাহিনীটা বলার সময় ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন- ‘আমি… নিজের হাতে.. খাতাখান দিছিলাম.. ইসস… আমি কি যে ভুল করলাম’ বলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন হোসেন শাহ্। পাশ থেকে ভক্তরা শান্তনা দেয় ‘কতই আর বয়স ছিলো, তখন আপনার বোঝার কথা না’

তিনদিন পর হোসেন শাহ্ সেই খাতা আনতে গেলে মশা ফকির তাঁকে বলেন যে পনেরো দিন পরে আসতে। পনেরো দিন পর আবার গেলে সেদিনও মশা ফকির তাঁকে খাতাটা দেননি। তারপর আর অনেকদিন মশা ফকিরকে দেখা যায়নি। বালক হোসেন শাহ্ বহুবার খুঁজেও তাকে পাননি।

তিন মাস পর কোন এক বাজারে হোসেন শাহ্ সেই মশা ফকিরকে হঠাৎ দেখতে পেলেই ছুটে গিয়ে তাকে ধরেন ‘আমার খাতা কই’ বলে। তখন সেদিন মশা ফকির জানান যে তিনি ‘আনোয়ারুল করীম’ নামে কুষ্টিয়া সরকারী কলেজের এক শিক্ষকের কাছে তেরশ’ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। তারপর হোসেন শাহ্’র ভাষায় ‘সেই খাতা কি আর পাওয়া যায়?’

উল্লেখ্য যে ড. আনোয়ারুল করীম হলেন প্রথম বাঙালী যিনি ‘ফোকলোর’ বিষয়ে পি এইচ ডি করেন, তিনি লালন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। ইন্টারভিউর সময় হোসেন শাহ্’র বয়স তখন আনুমানিক ৬৫ বছর (২০১২) কিন্তু বয়সের চেয়ে বেশী বিধ্বস্ত। তিনি প্রায়ই ‘আহারে আমি কি ভুল করলাম জীবনে’ বলে কাঁদেন। তিনি সেই ‘লাল বাঁধাই করা’, ‘এই মোটা খাতা’ টিকে মনে করেন লালনের একটি মূল খাতা যা মনিরুদ্দিন শাহ্ লিখেছিলো। হোসেন শাহ্’র গুরুর নাম আজীজ শাহ্, যার গুরু বাবুল রহমান ফকির ছিলেন পিতা ইব্রাহিম শাহ্ এর গুরু। এই ইন্টারভিউর প্রায় ২ বছর পর শ্বাসকষ্ট সহ নানান জটিলতায় ভুগে ২০১৫ সালে হোসেন শাহ্ মৃত্যুবরণ করেন।

 লালনের গানের খাতার বর্তমান চিত্র (২০১৩)

এছাড়াও ড. সৈয়দ আবুল আহসান এর কাছে মনিরুদ্দিন শাহ্ এর লেখা লালনের ৫৩০ টি গানের খাতার সূচীপত্র অংশটি আছে। যেটার ছবি তিনি তার সম্পাদিত লালনগীতির বইয়ের শুরুতে ছেপেছেন।

গ) বর্তমানে লালনের ২টি খাতাই পৃথিবীর বুকে আছে। শক্তিনাথ ঝাঁ যে দুটো শান্তিনিকেতনে খুঁজে পান। এ খাতা দুটোর ছবি তোলার ইচ্ছে আমার ছিলো। কিন্তু এ দুটো শান্তিনিকেতনের ’নন্দন’ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। শুনেছিলাম সে যায়গায় প্রবেশ সহজসাধ্য নয় সবার জন্য। তবুও আমি নিকেতনের গ্রাফিক্সের ছাত্র অর্ণব এর কাছ থেকে একটি ধার করা স্বল্প মেগাপিক্সেল সম্বলিত ক্যামেরা নিয়ে খাতা দুটোর ছবি তুলবার বাসনা নিয়ে ২০১৩ সালের এপ্রিলে (৪র্থ বারের চেষ্টায় ভিসা পেয়ে) সেখানে যাই। আমি ভেবে রেখেছিলাম যে খাতা দুটোর দেখা যদি নাও পাই, তবে ওটা যে আলমারীতে রাখা না হয় তার ছবিই তুলে আনবহবো।

না পেলে খাতার দ্যাখা একা একা তুলবো ছবি আলমারীটার, ভেঙে আলমারির চাবি ক্যামনে তুলি ছবি খাতার…

কিন্তু যায়গাটা একদমই অফিসিয়াল ও প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। বিল্ডিং এই ঢুকতে পারলাম না। আমি তো কোন ছাড়- নিকেতনের শিক্ষার্থীরাই সবাই সেখানে ঢুকতে পারেনা। বিধি মানলো না, খাতা তো দূরের কথা তার আলমারীটাও দেখতে পেলুম না! তাই ঐ তালাবন্ধ গেট ও বিল্ডিংটার ছবিই তুললুম। ছবিটার নাম দিলুম: লালনের গানের খাতার বর্তমান চিত্র।

 

Spread the love
  • 390
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    390
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন