একগুচ্ছ কবিতা || কবির কল্লোল

 পৃথিবী একটা কমলালেবু

পৃথিবীটা কমলালেবুর মতো।
মতো না হয়ে— যদি কমলালেবুই হতো!

একটা সুস্বাদু কমলালেবু। যার
পেটভর্তি পোকা। কমলাভোজী
পোকারা জানে না— বাসস্থান খেয়েই সে বেঁচে থাকে
পোকারা জানে না—
খেতে খেতেই সে বাস্তুহারা হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।

পৃথিবী একটা কমলালেবু। আর
আমরা মানুষ এবং অন্যান্য টানুষসমূহ
যারা বাস করছি, ভক্ষণ করছি এবং ভোগের মাধ্যমেই
জন্ম দিচ্ছি ভোগবাদী শৃঙ্খল। মূলত আমরা পোকা
কমলার পেটে ব’সে কুরে কুরে কোয়া খাচ্ছি।

পোকারা জানে না— খেতে খেতে কমলালেবুই ফুরিয়ে যাচ্ছে।

 

নাগরদোলা

দোলা  ঘুরছে।
র                           না
গ                                    ম
না                                      ছে
*                                          *
ঘু                                    ছে
র                              ঠ
ছে।   ঘুরছি।   উ

এইমাত্র মাটির খুব কাছে ছিলাম
আহ! সোঁদা গন্ধ। মাটির কাছে,
তবু স্পর্শ করা যায় না। একমুঠো
মাটি দলা পাকিয়ে ছুড়ে দিতে
ইচ্ছে করছে উপরে। আমার ঠিক
উপরে এখন আমেরিকা। যখন
নামবে, যখন পতন শুরু হবে,
এই মাটির সবগুলো ধুলোবালি
তার চোখে ঢুকে যাবে। আমি চীন,
আমি তখন উপরে। উঠছি। উঠছি।
আমি সবার নজরে। আমেরিকা
নেমে যাচ্ছে। আমেরিকা এতো নীচ!
নাগরদোলা ঘুরছে। আমি নামছি।

না

ছি
তবু ছুঁতে পারছি না মাটি। অসহ্য!


ছি

আমেরিকা নেমে যাচ্ছে। মাটির
খুব কাছে। নাগরদোলা থামবে।
ঘুরছে। আস্তে। খুব আস্তে। ঘুরছে।
থামবে। কে আগে মাটিতে নামবে?

 

 অন্ধ

চক্ষুষ্মানরা সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলো

—কী দেখলেন?
: দুটো কালো ফোঁটা
—আর?

আবারও খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো সবাই
: সাদা পৃষ্ঠা। পুরো পৃষ্ঠায় দুটো কালো ফোঁটা

অকাল-অন্ধ এক কিশোরকে ডেকে দেখালাম
—কী দেখতে পাও?
: অক্ষর। অসংখ্য জীবন্ত অক্ষর,
কালো কালো কালো অক্ষরের সমাবেশ
অক্ষরের মাঠ, মাঠে দুরন্ত কিশোর, ছুটছে
হাতে নাটাই, আকাশে ঘুড়ি, উড়ছে
মেঘ উড়ছে, কালো কালো মেঘ, অক্ষরের মেঘ
মেঘ থেকে ঝ’রে পড়ছে বৃষ্টি, অক্ষরের বৃষ্টি…

বলছিলো আর তার চোখ থেকে সত্যি সত্যি
গড়িয়ে পড়তে থাকলো বৃষ্টি! বৃষ্টিতে যখন
ভিজে যাচ্ছিলো মাঠ, চক্ষুষ্মানরা দেখলো
একটা সাদা পৃষ্ঠা অশ্রুতে ভিজে যাচ্ছে,
সাদা পৃষ্ঠাটিতে দুটোমাত্র কালো ফোঁটা!

 

 চাবি

কোমরে চাবিরতোড়া ঝুলছে। এদিক-ওদিক দুলছে

সম্রাটের মতো তুমি পায়চারি করছো
এদিক
থেকে
ওদিক
হে কারারক্ষী, সূত্রমতে তুমিও একটা চাবি
ঝুলে আছো অন্য কারো কোমরে
এদিক
থেকে
ওদিক
নিজেকে ঝুলতে দেখে কষ্ট পেও না।

তুমি যার কোমরে ঝুলে আছো তাকে এবং
তার মতো অনেকগুলো চাবিকে রিঙে ঝুলিয়ে
আঙুল ঘুরাচ্ছে যে বিচারক, আদতে সেও একটা চাবি।

 

মন্ত্রী মহোদয়ের জুতো

চাকরের উষ্কখুষ্ক চুল। মন্ত্রী বললেন
—এটা অফিস। বলেই একটা পা রাখলেন
জুতোসহ টেবেলির পরে
আর ছোকড়াটা খুব আগ্রহভরে
মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিপাটি করে নিলো চুল।

: মাফ করবেন, হয়ে গেছে ভুল।
তারপর বলল, স্যার,
সত্যিই আয়নার মতো ঝকঝকে জুতো আপনার
কোথা থেকে করেন এমন পলিশ?

—আরে আহাম্মক, কী যে বলিস!
চারপাশে এতো কুকুর থাকতে কে আর মুচির কাছে যায়?
তারা ঝুলিয়ে রাখে জিভ, আমি নিয়ম ক’রে চাটাই।

 

 আবর্তন

সন্ধ্যা নামলে— সূর্যটাকে আমেরিকান ব’লে সন্দেহ করি
যখন ভোর ফোটে— সন্দেহ বাড়ে, সারারাত
সমগ্র পশ্চিম ঘুরে ঘুরে সে নিশ্চয় সঙ্গে এনেছে
অতিবেগুনী উপনিবেশবাদ!

সন্ধ্যায়— আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে চ’লে যায়
ভোরে— ওদের কালচার নিয়ে ফেরে যেনো

যেনো সূর্যটাও বিক্রি হ’য়ে গেলো —এই দ্বন্দ্ব
মাথায় নিয়ে ঘুরি। তুমি প্রশ্ন করো—
‘পূর্ণিমায় ছাদে আসো না কেনো?’

—সূর্য আমেরিকায়। জ্যোৎস্নায় শেতাঙ্গ শেতাঙ্গ গন্ধ।

 

মিথ্যুকের মৃত্যুর পর

মিথ্যা বলতে বলতে
মিথ্যা বলতে বলতে অভ্যস্ত লোকটা
একদিন নিজেই এসে জানালো, সে ম’রে গেছে

মিথ্যা শুনতে শুনতে
মিথ্যা শুনতে শুনতে বিরক্ত আমরা
মিথ্যুককে সেদিন জনসম্মুখে পিটিয়ে মেরেছিলাম

তারপর একে অন্যের দিকে
মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে করতে আমরা
লক্ষ্য করলাম লোকটা চিৎপটাং হয়ে প’ড়ে আছে,
মৃত!

আমরা যখন লোকটাকে পেটাচ্ছিলাম
সে খুব কাঁদছিলো আর বলছিলো,
‘আমাকে মারবেন না, মৃত ব্যক্তি কখনোও মিথ্যা বলে না’

মিথ্যাকে ঘৃণা করতে করতে
মিথ্যাকে ঘৃণা করতে করতে সত্যবাদীরা
প্রকাশ্য দিবালোকে খুন ক’রে ফেললাম, আমরা খুনি

আমরা যাকে খুন ক’রে ফেললাম
তার নাম আয়না, অমিতাভ রেজার সিনেমায়
যে মিথ্যা ব’লে একবার নিজেকে খুনি প্রমাণ করেছিলো

এখন সে মৃত, আর যেহেতু
মৃত ব্যক্তিরা কখনোও মিথ্যা বলে না
এখন আমাদের দোষ আমরা কার ঘাড়ে চাপিয়ে দেবো?

 

 মাথা

মাথার ভেতরে—একজন সন্ত্রাসী ঘোরে
একজন মদ্যপ—একটি কিশোরী
ধর্ষিত হবার ভয়ে লুকিয়ে আছে গোপন কক্ষান্তরে

একজন মধ্যবিত্ত দিনমজুর
একজন বিশিষ্ট সমাজসেবী
একটি বিড়াল, একটি কুকুর
একজন ঘুমন্ত মুক্তচিন্তক
তথাকথিত একজন বাঙালি হুজুর

মাথার ভেতরে—একটি আধুনিক টেলিভিশন
রিমোটের ত্রস্ততায় ইচ্ছেমত, অনবরত
পাল্টাচ্ছি চ্যানেল এবং গোপন
কিছু বাসনা নিয়ে যে চোরটি স্বাধীন ঘুরছে ফিরছে
দরকার পড়লে তার কান ধরে টেনে
ঢুকিয়ে দিচ্ছি যার যার ব্যক্তিগত মাথার ভেতর

একটিমাত্র মাথায় এই যে নানাবিধ ঘোর
নিয়ে দিব্যি হাঁটছি চলছি, খাচ্ছি দাচ্ছি;
কই? সংঘর্ষ তো বাধছে না কোথাও, কারো সাথে।
অথচ পৃথিবীতে— পানের ভেতর চুনগুলো এমন অস্থির
আঙুলের সামান্য হেরফের হলেই খ’সেট’সে পড়ে

পৃথিবীটা কেনো যে একটিমাত্র মাথার ভেতরে ঘোরে না।

 

জাল

মাকড়শার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে একটি টিকটিকি
টিকটিকিকে লক্ষ্য ক’রে নেমে আসছে একটি শকুন
শকুনের বুকে নিশানা পরীক্ষা করছে একজন ধনুর্বিদ
পিছনেই ঘাপটি মেরে ব’সে আছে রক্তখেকো চিতা
চিতাটির পা একজোড়া সাপের গর্তে, ফণা তুলেছে সাপ
একদল বেজি এগিয়ে আসছে সর্পফণা লক্ষ্য ক’রে
বেজিদল লক্ষ্য ক’রে নেমে আসছে একটি ঈগল
ধনুর্বিদ দ্বিধান্বিত, নিশানা সে ঘুরিয়েছে ঈগলের বুকে
পিছনেই ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়েছে আরেকজন মানুষ
মানুষের মাথায় নিশানা লাগিয়েছে আরেকজন মানুষ
তার পিঠ থেকে কয়েকটি মশাকে রক্ত চুষতে দেখে
মাকড়শাটি বুনে যাচ্ছে জাল। পেছনে টিকটিকি…

 

 সময়

পথই প্রথমে আমার পায়ের কাছে এসেছিলো
এক পা বাড়াই… দুই পা বাড়াই…
পথের পা থেকে নিয়মমাফিক মাথার দিকে
হাঁটতে হাঁটতে আবিষ্কার করলাম—
আমিও একটা পথ;
সরীসৃপের মতো আমার বুকের উপর
নিঃশব্দে ব’য়ে যাচ্ছে সময়।

আমি থেমে যাই। সময় থামে না
আমি হাঁটি। সময় দৌড়াতে থাকে
আমি দৌড়াই। সময় উড়তে শুরু করে
আমি উড়তে যাবো
পথের পেট থেকে পা হড়কে যায়।
সময় আমার মাথায় চ’ড়ে বসে।

আমি থামি।
সময় সরীসৃপ হয়ে বয়ে যেতে থাকে।

টিফিন পিরিয়ডে কাকলী ম্যাডামকে দেখতাম
ম্যাডামকে আমার সময় মনে হতো।

আমি ঘুমোই।
ম্যাডাম সরীসৃপ হয়ে জেগে থাকেন।
আমি পড়ি। ম্যাডাম প্রশ্ন করেন
উত্তর লিখি। প্রশ্নের পরে প্রশ্ন করেন
আমি চিঠি লিখতে যাবো
ঢংঢং ঘণ্টা বেজে ওঠে
ম্যাডাম আমার খাতা কেড়ে নেন।

আমি একটা পথ
ম্যাডামও একটা পথ!
সেই পথেও একটা সময় বয়ে যায়!
ম্যাডামকে আমার সময় মনে হতো
তবে কি সময়ও একটা পথ?
সেই পথে আর কিছু বয়ে যায় সময়ের মতো?

এক পা বাড়াই… দুই পা বাড়াই…
পথের পা থেকে বুক পর্যন্ত পৌঁছাতেই
বুক বেয়ে সময় আমার মাথায় চ’ড়ে বসে।

 

 পাখিতে বিস্কুট ফেলে যায়

ইচ্ছে হয় ফিরে যাই লণ্ঠনের দিনে
পাখিতে বিস্কুট ফেলে যাক
একখানি তিনচালা ঘর, খড় থেকে কেন্নো পড়ুক
ঝিঁঝিঁপোকা দিক রেলডাক

মাড়ের গন্ধ নাকে লাগে
তুশ পোড়ে, পাতা পোড়ে, ধোঁয়া ধোঁয়া ঘ্রাণ
তালপাতা ছাউনির নিচে
আম্মা, আরেকবার উনুন জ্বালান

স্বরে অ—তে অভিনয় শুরু
স্বরে আ—তে আম্মা ও আমি
‘আশ্বিন গেলো, কার্তিক গেলো
মা লক্ষ্মী ঘরে এলো’, আম্মা, আপনি অন্তর্যামী

উশখুশ বালকের বুকে
ক্রিং ক্রিং সাইকেল থমকে দাঁড়াক
বৌচির আহবান রুখে দিক অদৃশ্য আঙুল
পাখিতে বিস্কুট ফেলে যাক।

 

 গরু ও শুকর

সহসা বনের মধ্যে মুখোমুখি গরু ও শুকর
সামান্যই চোখাচোখি, উল্লেখযোগ্য আর কিছু নয়
যেহেতু বিবাদ নেই, গোত্রের কিংবা খাদ্যের,
নেই ভয়
তিনটি নিরন্ন রাত পরে এই ভোর
তেমনি চোখাচোখি, যদিও ইচ্ছাকৃত; হলো আমাদের
আমরা দুজন, কবির ও কল্লোল, দুই মিতা
একজন কাফনে বিশ্বাসী, অন্যজন চিতা
একজন পানি এবং অন্যজন শুধুমাত্র জলপান ক’রে
অবশেষে তিনরাত পরে– একটা গরু আর একটা শুকর,
নাদুসনুদুস, এসেছে নজরে

এই মুহূর্তে আমাদের কাছে
যে সমস্ত সারভাইভাল উপকরণ আছে—

প্রথমত: গাছের শক্ত কাঁচা ডাল, যা দিয়ে
সহজেই প্রাণী দুটোকে দিতে পারি চার ঘা বসিয়ে
দ্বিতীয়ত: মোটা পাটসুতোর দড়ি
আটখানা পা বেধে ফেলা যাবে তড়িঘড়ি
তৃতীয়ত: দু’দুটো ধারালো ছুরি, চকচকে
গলার নলী কেটে দিলে রক্ত গড়াবে, থকথকে
চতুর্থত: আগুন জ্বালবার প্রতিভা, নিষ্ফল
মাংস পুড়িয়ে খাওয়া যাবে, ফুটানো যাবে জল

কবির ও কল্লোল, আমরা মিতা, দুইদিকে যথাক্রমে
গরু ও শুকর মেরে থামলাম, ক্লান্ত দুই যমে
যৎসামান্য মাংস নিয়ে একই আগুনে পুড়িয়ে খেলাম
আর ঢেকুর তুলতে গিয়ে মায়া হলো, আহা
কেমন হতো যদি দুজনেই চিতা কিংবা দুজনেই কাফন হতাম!

Spread the love
  • 197
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    197
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন