একগুচ্ছ কবিতা ।। ইয়ার ইগনিয়াস

না-হওয়া কথারা

না-হওয়া কথারা জেগে থাকে ঘুমগন্ধি রাতে
এই অশীতিপর অন্ধকারও ঝরা বকুল- সূর্য ওঠার আগে
রোদের বাগানে হেসে ওঠে ভ্রমররহিত ভোরফুল
আকাশের আর্কাইভ থেকে এই দৃশ্য চির প্রচারিত
না-হওয়া কথারা জেগে থাকে তবুও
নিকষিত নিকোটিনের
আলোয় – ভাঙা অর্গান বাজিয়ে বাজিয়ে
কাটিয়ে দেয় নিরন্ন-দুপুর।
স্মৃতিপুরে কাঠঠোকরার ন্যায়
ঠুকরে ঠুকরে খায় কৃশকায় আত্মার ফসিল।
না-হওয়া কথারা জেগে থাকে বুকের ব্যাসে
উজিয়ে সন্ধ্যার আঁধার ।

 

হারমিসের বাঁশি

মাগরিব-মার্গে হেঁটে হেঁটে অবসন্ন দুপুর, নিম-নিচে জিরিয়ে নেয়। ক্রমশ ফণা নামিয়ে ধেয়ে যায় সরীসৃপ সূর্যালোক- অন্ধকারে- অভিসারে। কৃষ্ণপক্ষেও আলো ছড়ায় কিছু জোনাকপাখি।
পোতাশ্রয়ে ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে ডাহুকের ডাক- আমাকে তবুও জাগিয়ে রাখে যুবতীর ব্রীড়ানত বুক। দুষ্মন্তের দেশে এটা দুষ্কৃতি নয়; হার্মিসের বাঁশি যাকে প্রলুব্ধ করেছিলো শৈলজ শকুন্তলা’য়।
দিনে সারস ও কচ্ছপের খামারে কাজ করি, রাতে পাহারা দিই মৃত্যুর দরোজা। এন্ট্রিলিস্ট চেক করে জেনেছি এখানে হারমিস আসেন কদাচিৎ, আমি তার অপেক্ষায় থাকি। যেন তার কাছে শিখে নিতে পারি বীণা তৈরীর তরিকা। কেননা, আমি ডুকে যেতে চাই, যুবতীর কশেরুকায়।

 

পূণর্জন্ম

বাবা মারা যাওয়ার পর প্রায় প্রতিদিন-ই আমার সাথে কথা হতো, টিউলিপ-দলে শিশিরের মতো ঝরঝরে ভাষায়, স্বল্পদৈর্ঘ্য স্বপ্নে। প্রতিমার ঔরসে যেদিন পুত্র পললের জন্ম হলো,ওইদিন থেকে আজতক না-স্বপ্নে না-কল্পে তিনি আর আসেননি।

 

পাপ
সুজানা তোমার কাছেই জমা থাক বিগত জীবনের পাপ। এখনই কাউকে কিছু বলো না। সূর্যের হা-মুখে যেদিন লীন হবে পৃথুলা পৃথিবী, সেদিন পাপের দামে দোযখে একটা প্লট কিনে নেব। জানই তো, স্বর্গ কিনতে কত লবিং করা লাগে।

তা হোক দোযখে, আমি তো জলে ও জ্বলনে তোমাকেই চেয়েছি।

 

অদম্য অাষাঢ়

স্নিগ্ধ হাওয়ায় বাজে পাতার পিয়ানো। মিকাঈলের বিপরীতে পাল বেঁধে উড়ে কৃষ্ণমেঘ। উড়ন্ত মেঘের শার্সিতে সূর্যসত্ত্বা মুছে গেলে, অসম্ভব অস্থৈর্যে কাঁদে আকাশ। বেহুলার ভানে ভেজায় মৃণ্ময়-মাদুর। উর্বশীর কামার্ত বুকের ঢেউ নিয়ে জেগে ওঠে মুমূর্ষু নদী। স্মৃতিঘরে যুগপৎ জাগে বৃশ্চিকা বৃষ্টি। চোখ তার চিরসুপ্ত নদী, বিরহে বেজে ওঠে তুমুল। অনবদ্য আষাঢ়ে ভেসে যায় অতীত পৃথিবী আমার। কদম্বের দম্ভে দাঁড়িয়ে ঠায়, ভিজে যাই, সর্বস্ব ভাসাতে

ভাবি – অদম্য আষাঢ় কতটাই বা ভেজাতে পারে, যতোটা ভিজি চোখের জলে!

 

বোবা ভিখিরির গান

পা-হারা লোকটা পাহারা দেয় একজোড়া পাদুকা
রোজ দেখি এই শিল্পদৃশ্য, অফিস পাড়ায়
সমুখে থালার শূন্য, টাকাকড়ি নেই
হাত-পাও ছেড়ে দিয়ে পড়ে আছে কিছু হাহাকার
কিছু হা হা-ও ভেসে আসে পাশের ভিখিরির
তার স্বরবোধে
কৌতূহলের কাতুকুতুতে একদিন তার কাছে যাই
শুধাই কাহিনী, কিন্তু;
ঠোঁটস্য কারার কপাট ভাঙতে পারেনা বোবা ভাষা
আলজিব অন্ধকারে পড়ে থাকে সব স্বর
ইশারাবনে হারাই, কংফুমান ভাষার
কিছুই বুঝিনি , অজানাই থেকে যায়
লোকটা কী ভিক্ষা চায়?
টাকা? না-কি হারিয়ে যাওয়া পা?

 

রিভাইভ অফ রেভ্যুলেশন

স্মৃতির জলছাপে অনুবাদ হয় না আর বাঘের অবয়ব। ব্যাঘ্রচোলক পরে নিজেই হই কৃত্তিবাস। সমূহ শঙ্কায় টলিনি কখনো, বাধা-বাকশালে স্থির স্ট্যাচু। সতত বরণ করি সমুখ সমর। কোবিদ কৃষাণের মতো কর্ষণ করি মননের পলল দ্রোণ। রিভাইভ অফ রেভ্যুলেশনে চে’ হাসে, দিকপাশ দ্যুতি ছড়ায় তার শিরস্ত্রাণের ফুল।

 

প্রতীক্ষা

সোডিয়াম চাঁদের চাতুর্যে গলে যায় রাতের মোমশরীর। আমার প্রতীক্ষমান পথ যেন দমকাবিলের দৃষ্টি-দীর্ঘ আ’ল। বকুলঘ্রাণের চেকপোস্টে আটকে গেলে কি? চারদিকে সান্ত্রি পেতে আছে সশস্ত্র কুয়াশা। এইসব চক্রব্যূহ উপেক্ষা করে সে ফিরেছিলো, মৌরিবনে।

সম্মোহনী সুরে বেজে ওঠে পাঁজর পিয়ানো। বেজে বেজে ক্রমে বাড়ে নিঃশ্বাসের নিঃশঙ্ক সাইরেন। শ্বাসের সন্তাপে পুড়ে নির্ভুল তিলাওয়াত করি তাকে, দেহজ মাখরাজে। লাল মসজিদের সুরস্য আজান ভেসে আসলে ভোরের বাতাসে,
যতি টানি দেহপুরাণের পাঠ।

আলোর পরোক্ষ পেরোলে আটকে যায় পা, তার আর ফিরে যাওয়া হয় না। বদ্ধকক্ষে যুথবদ্ধ গুটিয়ে গিয়ে আমরা জোড়া-শামুক। পরিযায়ী পাখির চঞ্চুতে পৌছি নদীতট। নগ-নদী, গিরি-পথ, উপত্যকা ঘুরে ঘুরে দিগম্বর দিগন্তে মাখি গোধুলির রং। ঝিঁঝিঁর নেমন্তন্নে আসা আগন্তুক অন্ধকার খুলে দিলে সাঁটানো দরোজা, পা’র পেরোল। সে পা বাড়ায় বকুলগন্ধা পথে…

কে জানতো, এই টুকরো অন্ধকারই মোপালির নিশ্চিত সেঞ্চুরিয়ম? আর ফেরেনি, ফিরবে কি ফিরবে না, তাও নেই জানা।

কেউ কেউ তো ফেরেই বুকে নিয়ে বিষণ্নতার গান।

 

 

বেদনার বিউগল

সচল ঘড়ির
সেকেণ্ড নির্দেশক কাঁটার অবিকলে
বিরতিহীন বেজে যাচ্ছে বেদনার বিউগল
নিকোটিন পুড়াতে পুড়াতে যে জল
বহমান বাকখালী মোহনায়-
তার উৎসমূল তো আমার দুচোখ;
সে ভাসানে হারিয়ে যাচ্ছে কতিপয়
ছিন্নমূল সুখের বোচকা
তাকে নিরখাও কুহেলি
সুখদ সঙসারে অন্ন হবে তোমার
পালিতা পায়রার।

 

 

ম্লান স্মৃতির পাশে

অধিক ক্ষরণের অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থাকে
জোড়া-অশ্রুবিন্দু
তুমি তাদের কী-নামে ডাকবে?
শোকশ্রু নাকি সুখশ্রু?

অস্ত যাওয়া তারাদের নামে কোনো রাস্তা থাকে না
সৌরশূন্যের-কক্ষপথে,
তবে কীসের ভিত্তিতে আঁকো নাম
পাথর ফলকে; হৃদয়-প্রবেশিকায়!

নতুন ক্ষত পুরনো জখমকে স্মরণে আনে চিরদিন
তথাপি বারংবার বিরহে
আমাকেই পড়বে মনে ভাবি না এমন;
হোমো পাখির চিৎকারে
অাঁধার আড়াল করে নেমে এলে আলো
প্রত্যেক পুরনো ভোরই কি মনে পড়ে তোমার?
কিংবা কারও?

আদতে ম্লান কোনো স্মৃতির পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ
দেয়ালে যেমন লেগে থাকে পুরাতন পোস্টারের স্মৃতি।।

 

 

পলাতক প্রতিবিম্ব

তরুণ সূর্যের নিচে একদিন হারিয়েছি যে ছায়া, তার খোঁজে ভেদ করেছি দিকচক্রবালের অজস্র চক্রব্যূহ। ছায়ার সন্ধানে সতত ঘুরেছি জরিপীয় জনপদ-জলপথ ও বনপথে। ভাস্কো দা গামার মতো ঘুরে ঘুরে নির্ণয় করেছি অজস্র অনির্ণীত পথ -আড়ালে থেকে গেছে আরাধ্য আদল। মল্লযুদ্ধে হেরে যাওয়া সৈনিকের মত অবসন্ন হয়ে বুদ্ধের মুদ্রায় বসে আছি বোধিবৃক্ষতলে। না, কোনো নির্বাণ লিপ্সায় নয়; প্রশস্ত প্রশান্তির নিচে জিরিয়ে নিচ্ছি ধ্যানী বক।

তীব্র মধ্যাহ্নে আজও খুঁজি ইশকুল ফেরত ইসকন বালিকাদের ভিড়ে -হারানো রৌদ্রাভাব, পলাতক প্রতিবিম্ব।

 

আরাধ্য আরাকান

সেই কবে থেকে পেতে আছি শূন্য-করতল
কবুল করে নাও – এই জ্বলজ্বল জলজ চোখ;
অযুত অনুযোগ ও অব্যক্ত অভিসন্তাপ।

বুকের বিপরীতে তাক করা বন্দুক
স্বজনের রক্তে হোলি খেলছে বর্বর বর্মী বাহিনী
এই অমসৃণ প্রতিবেশে পরিযায়ী নিজদেশে

প্রভু হে, অনুরণনময় প্রার্থনায় জাগো এবার
মৌলিক মোজেজায় তোলে দাও মোজেসের লাঠি
কাল-নাগ হয়ে দংশাবো নাসাকার নাসিকায়

দগ্ধ ফিনিক্স যেমন গায় কাঙ্ক্ষার গান
সে সুর সকাশে কোথাও বাজে প্রকট
দুচোখে সমান কান্তি ছড়ায় আরাধ্য আরাকান।।

Spread the love
  • 75
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    75
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন