ভাতিজার চোখে ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু’।।অনুবাদঃ মাহমুদ মিটুল(প্রথম পর্ব)

‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু’; মূলঃ শিশির চন্দ্র বসু, অনুবাদঃ মাহমুদ মিটুল 

 

ভূমিকা

এ-গ্রন্থটি ১৯৮৬ সালে কলকাতা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। ওই সংস্করণটি যদিও বেশকিছু উৎসাহী পাঠক হাতে পেয়েছিলো; কিন্তু সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা অগণিত সক্রিয় পাঠকদের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি, যে পাঠককুল নেতাজী’র একটি সংক্ষিপ্ত ও নির্ভরযোগ্য জীবনী খুঁজছেন। এন.বি.টি., ভারত-কে ধন্যবাদ; তাদের প্রচেষ্টায় সেটা সম্ভব হচ্ছে। উক্ত ট্রাস্ট বিগত বছরে ভারতের মূখ্য ভাষাগুলোতে আলোচ্য গ্রন্থটির অনুবাদ প্রকাশ করেছে।

এই জীবনীগ্রন্থের উদ্দেশ্য হলো সাধারণ জিজ্ঞাসু পাঠক, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যাদের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে সরাসরি কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এছাড়া, যারা নেতাজী ও তাঁর সময় সম্পর্কে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা করতে চান, এ-গ্রন্থটি তাদের জন্য গাইড ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস হিসেবে থাকবে।

মাত্র একশো ঊনচল্লিশ পৃষ্ঠায় আমি বিস্তৃত ইতিহাস উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি, তবে সতর্ক থেকেছি যেনো তৎকালিন ভারতীয় ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা অবস্থা, কোনো মহান ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্মের কথা বাদ না পড়ে। কোনো বিষয়ের প্রতি আমার নিজস্ব মতামত ও ব্যাখ্যা প্রদান ব্যতিরেকে সকল ঐতিহাসিক ঘটনা ও দলিল এবং সেসব নিয়ে নেতাজীর প্রতিক্রিয়া ও ব্যাখ্যার প্রতি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বস্ত (মোহমুক্ত) থাকার চেষ্টা করেছি। ভারত ও অন্যান্য দেশের পাঠকের সামনে এই গ্রন্থ কেনো হাজির হলো তার একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। স্বধীনতা উত্তর ভারতে সুভাষ চন্দ্র বসু কখনোই সমাদৃত ছিলেন না। দ্যা একাডেমি ইন ইন্ডিয়া ও সংকীর্ণ আমলাতন্ত্র নিজেদের স্বার্থ হাশিলের জন্য বিষয়টাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পঁচিশ বছরে মহাত্মা গান্ধীর একমাত্র বিকল্প নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করলো। স্বীকৃতি ছাড়াই, স্বাধীনতার পর থেকে কয়েক প্রজন্ম ধরে সুভাষ চন্দ্র বসু ভারতীয় জনতার কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় জাতীয় নেতা। চিন্তা-বিচার-মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষের একজন হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, যাই-হোক-না-কেনো ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ ও ত্রিপুরীতে মহাত্মা গান্ধী ও নেতাজীর বিতর্ক এবং এর পরিণাম নিয়ে প্রতি পাঠকের উচিৎ মোহমুক্ত হয়ে বিষয়টি উপলব্ধি করা।

পাঠকের সুবিধা বিবেচনা করে পুরো গ্রন্থকে ষোলোটি বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রথম সংস্করণের সংক্ষিপ্ত জীবনী হালনাগাদ করা হয়েছে। সূচীপত্র যুক্ত করা এই সংস্করণের আর একটি দরকারি সংযোজন।

আমি ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টকে তাদের আগ্রহ ও সহযোগিতার জন্য আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সঠিক কাহিনি জানতে আগ্রহী পাঠকগণ যে এ-গ্রন্থটি সাদরে গ্রহণ করবেন সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

৯ ডিসেম্বর ১৯৯৯
শিশির কুমার বসু
‘বসুন্ধরা’
৯০, শরৎ বসু রোড
কলকাতা- ৭০০০২৬

 

 

 

পরিবার ও বাল্য শিক্ষা

 

১৭৫৭ সালে দখলদার ব্রিটিশদের হাতে বাঙলা পতনের পর ভারতীয় জনতা তাদের হারানো স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার কল্পে পরবর্তী একশো বছরে বেশ কিছু তিক্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। ভারতীকে মুক্ত করতে ১৮৫৭ সালে মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহের আমলে তারা শেষ যুদ্ধ করেছিলো। যদিও তাদের এই নায়কোচিত আত্মত্যাগ কোনো উপকারে আসেনি এবং ত্রুটিপূর্ণ নেতৃত্ব চূড়ান্ত পতনের দিকে টেনে নিয়েছিলো। স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধে পতনের পর ১৮৫৮ সালে ভারতের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। ব্রিটিশ উপনিবেশী আগ্রাসন সুসংগঠিতভাবে সমগ্র ভারতে ঝেঁকে বসলে এই উপমহাদেশের সমকালীন ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়েছিলো। সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মসাল ১৮৯৭- ১৮৫৭ পরবর্তী নব্বই বছরের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এর চল্লিশ বছর পূর্বে ভারতীয় জনতা তাদের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলো এবং এর পঁয়তাল্লিশ বছর পর সুভাষ চন্দ্র বসু স্বদেশের স্বাধীনতা লাভের উদ্দেশ্যে চূড়ান্তভাবে সশস্ত্র যুদ্ধের দেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ রাজত্ব যখন রানী ভিক্টোরিয়ার শাসনের গোল্ডেন জুবিলি উদযাপন করছে, তখন উড়িষ্যার ছোট্ট একটি শহরে জন্মগ্রহণ করছেন অকুতোভয় ও ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক, যিনি ঠিক ৪৫ বছর পরে এই ব্রিটিশ রাজত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। এমনকি, নেতাজীর জন্মলগ্নকে ভারতীয় জনতার দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য বিন্দু হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়।

সুভাষ চন্দ্রের পিতা জানকীনাথ বসু অবিভক্ত বাংলার চব্বিশপরগণা জেলার ছোটো একটি গ্রাম থেকে উঠে আসেন এবং আইন চর্চার জন্য কটকে আবাস গেড়ে বসেন। কটক ছিলো বাংলা প্রদেশের প্রত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি শহর যাকে পরবর্তীতে উড়িষ্যার রাজধানী করা হয়েছে। এ অঞ্চলের সাথে কলকাতার কোনো রেল সংযোগ ছিলো না। জীবীকার সন্ধানে কটকে অবস্থান করা জানকীনাথের কাছে রোমাঞ্চকর ব্যাপার ছিলো। ভাগ্য সাহসীর সঙ্গেই থাকে এবয় সুভাষ চন্দ্রের জন্মের সময়টাতে জানকীনাথ অত্র এলাকায় আইন ব্যবসায়ে চরম শিখরে পৌঁছে যান। তিনি রাষ্ট্র পক্ষের উকিল এবং কটকের প্রথম নন-অফিসিয়াল চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। ১৯১২ সালে তিনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল-এর সদস্য ছিলেন। এমনকি সরকারি উকিল থাকা অবস্থায়ই তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কগ্রেস-এর অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, যার ফলে সময়ে সময়ে তিনি কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়েছিলেন। ১৯৩০ সালে যখন মহাত্মা গান্ধী সিভিল ডিসভিডিয়েন্স আন্দোলন ত্বরান্বিত করছেন এবং ব্রিটিশ সরকার বর্বরোচিত নিষ্পেষণ চালাচ্ছে, তখন জানকীনাথ এর প্রতিবাদে রায়বাহাদুর খেতাব পরিত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন মহৎ ও জনহিতৈষী, গভীরভাবে ধার্মীক এবং খাদি, স্বদেশী পণ্য ও জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন বড়ো সমঝদার। যখন তার দুই ছেলে শরৎ ও সুভাষ নিজেদেরকে কংগ্রেস ও জাতীয় কাজে নিয়োজিত করেন তিনি তাদের প্রতি আন্তরিক সমর্থন দিয়েছিলেন।

সুভাষের মা কলকাতার উত্তর অঞ্চলের হাটখোলার ঐতিহ্যবাহী দত্তবাড়ির মেয়ে। তিনি আট পুত্র ও ছয় কন্যার জননী, সুভাষ তাদের মধ্যে নবম। তিনি একজন বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন শক্ত মনের নারী এবং তীক্ষè ছিলো তাঁর কা-জ্ঞান। পুরো পরিবারটিতে তাঁর প্রভাব ছিলো এবং দক্ষতার সাথে এই বিশাল সংসার পরিচালনা করতেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে দুই পুত্র সুভাষ এবং শরতের সেই কষ্ঠভোগ ও আত্মত্যাগ তিনি এবং তাঁর স্বামী উভয়ই মুখবুঝে সহ্য করেছেন। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন সুভাষের প্রথম আটক হবার সংবাদ তাঁদের কাছে আসে, তাঁর বাবা বড়ো ছেলে শরত বসুকে এক চিঠিতে জানানÑ “আমি সুভাষ এবং তোমাদের সবার জন্য গর্বিত।” তাঁর মা বলেছিলেন যে তিনি এটা প্রত্যাশা করেছিলেন, কারণ তিনি তহাত্মা গান্ধীর ‘আত্মত্যাগের মতবাদে’ বিশ্বাস করেন এবং আরো বিশ্বাস করেন যে এই মতাদর্শের চর্চাই দেশের স্বাধীনতা বয়ে আনবে।

পরিবারটির ইতিহাস জানতে প্রায় সাতাশ পুরুষ পেছনে যেতে হবে। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা হলেন কোনো এক দশরথ বসু। তাঁর পরবর্তী বংশধরেরা কলকাতা শহরের দশ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত মহিনগর নামক গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। তখন থেকে তাঁরা মহিনগরের বসু পরিবার নামে পরিচিত হয়ে আসছে। দশরথ বসুর পরবর্তী এগারোতম পুরুষ মহিপতি বসু ছিলেন একজন অসাধারণ ব্যক্তি। তিনি তৎকালীন বাংলার নবাবের দৃষ্ঠি আকর্ষণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে নবাব তাঁকে অর্থ ও যুদ্ধমন্ত্রী পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এছাড়াও, মহিপতি বসুকে ‘সুবুদ্ধি খান’ খেতাবে ভূষিত করা হয়েছিলো। নবাবের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে বেশকিছু সম্পত্তির ‘জায়গির’ করা হয়েছিলো। বর্তমানেও গ্রামটি সুবুদ্ধিপুর নামে পরিচিত। মহিপতি বসুর কয়েক পুরুষ পরে গোপীনাথ বসুর জন্ম। গোপীনাথ বসু ছিলেন ব্যতিক্রমী দক্ষতা ও ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি পনেরো শতকের শেষ দিকে সুলতান হোসেন শাহের নৌ-কমান্ডার ও অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত ছিলেন। তাঁর দুর্ধর্ষ খেতাব হলো ‘পুরন্দর খান’ এবং তাঁর ‘জায়গির’কে এখনো পুরন্দরপুর বলা হয়, মহিনগরের কাছেই অবস্থিত। পুরন্দর এবং তাঁর পরবর্তীরা মন্ত্রী বা সেরকম ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ার ফলে তাঁদের পরিবার ছিলো বেশ প্রভাবশালী। এবং পুরন্দর মহিনগরে বসবাসের করার ফলে এ অঞ্চলটি দক্ষিণ বাংলার ‘কায়স্ত’দের নার্ভ সেন্টার (কেন্দ্র) হয়ে ওঠে। এছাড়াও, পুরন্দর খান একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে তাঁর স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি লক্ষাধিক ব্যক্তিদের সমবেত করে কায়স্তদের মধ্যে পশ্চাৎপদ ধারণাগুলো বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং সংস্কারের মাধ্যমে পুরো সম্প্রদায়ের মধ্যে একতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। বিপুল জনতার পানি সংকট দূর করার লক্ষ্যে তিনি বেশ কিছু লোক নিয়োগ দিয়ে দীঘি খনন করান। কর্মীরা দিনশেষে কাজ শেষ করে মহিনগরের একস্থানে তাদের কোদাল জড়ো করতো এবং পরবর্তীতে সেই স্থানটির নাম হয় কোদালিয়া। এখানেই বসুদের পারিবারিক বাসস্থান গড়ে ওঠে এবং সেই ঘরে জন্ম নেন জানকীনাথ বসু। জানকীনাথ এবং তাঁর ছেলেমেয়েরা কোদালিয়ার প্রতি বেশ অনুরক্ত ছিলো। গ্রাম ছাড়ার পরও জানকীনাথ গ্রামের মানুষের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং তাদের উন্নতির জন্য কাজ করতেন। তিনি গ্রামবাসীর মধ্যে দূর্গা পূজাকে ভ্রাতৃবন্ধন রূপে প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রতিবছর এই অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর পরিজন নিয়ে অংশগ্রহণ করতেন। এমনকি নিছক পনেরো বছরের বালক সুভাষ তাঁর মা পার্বতীকে গ্রামের অভিজ্ঞতা জানিয়ে চিঠি লিখেছেন। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শরতচন্দ্র কোদালিয়া গ্রামের উন্নয়নে কাজ করেছেন।

বসু পরিবারের পাশাপাশি কোদালিয়া গ্রামে আরো অনেক স্বদেশী-বিল্পবী ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছেন, যাঁরা ভারতের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব উজাড় করেছেন। এম. এল. রায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

সুভাষ চন্দ্র বসু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন: “শৈশব স্মৃতিতে আমি নিজেকে এমন অবস্থায় পাই যেখানে আমি ছিলাম সামগ্রীক বিবেচনায় একজন তুচ্ছ ব্যক্তি।” শৈশবে তিনি পিতামাতার সাথে আরো ঘনিষ্ঠ থাকতে চাইতেন; কিন্তু বড়ো পারিবারিক পরিমন্ডল ও রাগী পিতামাতার দ্বারা সবসময় তা সম্ভব হতো না। এটা খুব মজার ব্যাপার যে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জীবনেতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রথম অবস্থায় (শৈশব-কৈশোরের দিনে) তিনি নিজেকে তুচ্ছ একজন হিসেবে বিবেচনা করতেন।

পরিবারের অন্যান্যদের মতো সুভাষকেও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য কটকের প্রোটেস্টান ইউরোপিয়ান স্কুলে পাঠানো হয়েছিলো। স্কুলটিতে ইংরেজদের আদলে এবং ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হতো। ফলে সুভাষ ও এখানে পড়–য়া অন্যান্য ছাত্ররা ভারতীয় স্কুলে পড়–য়া সমবয়সীদের তুলনায় ইংরেজি ভাষা ও তাদের তাদের বিষয়ে গভীর জ্ঞান লাভ করে। এছাড়াও এ-স্কুল তাদের মনে শৃঙ্খলা, ভালো আচরণ, কাজকর্মে পরিচ্ছন্নতা এবং সময়ানুবর্তিতার বোধ গেঁথে দিয়েছিলো। সুভাষ এ-স্কুলে অখুশি না থাকলেও বেশ বছর পর সে বুঝতে পারে যে তাঁরা দুটি বিচ্ছিন্ন জগতে বাস করছে, যেখানে একে অপরের কোনো মিল নেই। পড়াশোনায় সে খুব ভালো করলেও খেলাধুলায় খুবই খারাপ করতো। ১৯০৯ সালে কোনো ধরনের খেদ না করে তিনি ইউরোপিয়ান মিশনারি স্কুল ত্যাগ করেন।

পরবর্তীতে তিনি রভেনশ কলেজিয়েট স্কুল-এ ভর্তি হলে তাঁর মানসিকতার আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। নতুন স্কুলে ভারতীয় আবহ তাঁকে নিজের উন্নতির দিকে মনোনিবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং এর ফলে তাঁর আত্মপ্রত্যয় দৃঢ় হতে শুরু করে। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিলো যে তিনি মাতৃভাষা বাংলা ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে খুব ভালো ফলাফল করবেন, কারণ তাঁর প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলা পড়ানো হয়নি। কিন্তু তিনি বাংলা বিষয়ের উপরও জোর দিয়ে পড়াশুনা করে খুব ভালো ফলাফল করতে থাকেন। এমনকি বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি বাংলায় সর্বোচ্চ নাম্বার অর্জন করেন। এরপর তিনি সংস্কৃত ভাষার গভীর পাঠ নেওয়া শুরু করেন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত খেলাধুলায় তিনি অমনোযোগী থেকে যান এবং পরবর্তী জীবনে এজন্য বহুবার আফসোস করেছেন। রভেনশ কলেজিয়েট স্কুল-এ তখন অসংখ্য ওড়িয়া ও বাঙালি ছাত্র-শিক্ষ ছিলো এবং সবাই আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলতো। একই রকম আন্তরিকতা দেখা গেছে বসু পরিবারের কর্মচারিদের মধ্যে যেখানে ওড়িয়া ও বাঙালি এমনকি হিন্দু-মুসলমান থাকা সত্ত্বেও সবাই সুসম্পর্ক বজায় রাখতো। সুভাষ চন্দ্রের পিতা-মাতার উদারতা ও সমবেদনার কথা সবার জানা ছিলো যা সরাসরি তাদের পরিবারের সবার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে সুভাষেরা তাঁদের প্রজন্মে কোনো ধরনের সংকীর্ণতা বা আঞ্চলিকতার দ্বারা তাড়িত হওয়ার সুযোগ পাননি।

শিক্ষকদের মধ্যে সুভাষের তরুণ মনে যিনি সবচেয়ে বেশি রেখাপাত করেছেন তিনি হলেন রভেনশ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাস। তিনি তাঁর ছাত্রদের মধ্যে ‘নৈতিকজ্ঞান ও নন্দনবোধ’ জাগ্রত করেন। এই শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের বলতেন যে মানুষের জীবনে নৈতিকতাকে অন্য সবকিছুর উর্ধ্বে রাখা হয়। তিনি সুভাষকে বলতেন যে নিজেকে প্রকৃতির কাছে পুরোপুরি সপে দাও এবং দেখবে প্রকৃতি তোমার সাথে কথা বলতে শুরু করবে। এরপর থেকে সুভাষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দর্শনে নদীর পাড়ে বা পাহাড়ে বা নির্জন উপত্যকায় চলে যেতেন এবং গিয়ে গোধূলির মন্ত্রমুগ্ধ সৌন্দর্য্য দেখতেন এবং ধ্যান করতেন। শিক্ষক বেণীমাধবের শিক্ষা তাঁর সামনে প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে বন্ধনকে উন্মোচন করে দেন এবং তা তাঁকে মানসিকভাবে স্থির হতে সাহায্য করে।

পনেরো বছর বয়সে সুভাষ চন্দ্র তাঁর জীবনের মানসিক ও শারীরিক উভয় দিকেই ঝঞ্ঝাপূর্ণ পর্বে উপনিত হন। তিনি নিরে মধ্যে তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব ও যাতনা অনুভব করতেন। এই মানসিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত হলো জীবনের সৌন্দর্য্যপ্রীতি-সাধনা ও জাগতিক শারীরিক কামনা-বাসনা এবং তাঁর অন্তরাত্মা এ থেকে মুক্তির উপায় খোঁজা শুরু করলো। প্রকৃতির সাহ্নিধ্যে থাকায় এর কিছুটা উপশম হলেও তা এই দ্বন্দ্ব ঘুচানোর জন্য পর্যাপ্ত ছিলো না। এই অবস্থায়, অর্থাৎ তিনি যখন পনেরো বছরে, তাঁর জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ প্রবেশ করেন। এই সুযোগে তিনি স্বামী েিববেকানন্দের কাজে মনোনিবেশ করেন। তিনি স্বামীজীর কথামৃত অনুসরণ করেন এবং মানসিক দৃঢ়তা লাভ করেন। তিনি পেয়ে যান সেই মূল মন্ত্র যা তিনি খুঁজছিলেন এবং যার জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন সারাজীবন। স্বামীজীর লেখা পাঠ করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনিত হন যে জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ ব্যক্তির নিজের পরিত্রাণ লাভের জন্য কাজ করে যাওয়া এবং ব্যক্তির উচিৎ সার্বিক মানবতার উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করা। সিস্টার নিবেদিতার মতো তিনিও মনে করতেন যে নিজ দেশের জন্য কাজ করাও মানবতার জন্য কাজ করা, কারণ, স্বামী বিবেকানন্দের কাছে, “তাঁর পূজার রানী হলো তাঁর মাতৃভূমি”। সুভাষ বসু স্বামীজীর এই নীতি গ্রহণ করেন যে প্রত্যেক ভারতীয় তাঁর ভাই এবং ভারতের মুক্তি নির্ভর করে “জনশক্তির” জাগরণের উপর। সুভাষ চন্দ্র বিবেকানন্দের দেওয়া পুরাণের আধুনিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করেন যেখানে বলা হয়েছে যে বিশ্বাসের শক্তিই পরিত্রাণের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

সুভাষ পরবর্তীতে বিবেকানন্দের হাত ধরে তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন, যাঁর (রামকৃষ্ণের) শিক্ষা হলো একমাত্র আত্মত্যাগের মাধ্যমেই উপলব্ধি ও পরিত্রাণের গন্তব্যে পৌঁছা যায়। তিনি রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের তরুণ অনুসারীদের সাথে (তাদের সংঘে) অংশগ্রহণ করেন। পরিবার ও পরিবারের বাইরে ওই সংঘ সচেতনতা সৃষ্টি ও বিরোধিতা করলেও তা কোনো উপকারে আসেনি। পারিবারিক বাধ্যবাধকতা লোপের জন্য উদ্বাত্ত আহ্বানের মাধ্যমে সুভাষ চন্দ্র সামনে এগিয়ে যান। পরিবার ও সামাজিক অপশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার পাশাপাশি তাঁর ভিতরে আত্মিক উন্নতির সংগ্রামও চলতে থাকে। সংকটপূর্ণ অবস্থায় সুভাষ বসু ঘরের বাইরেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি খুব মনোযোগ সহকারে যোগ সাধনার সব বই পড়ে ফেলেন, ভাবলেন যে সবকিছু আত্মিক সাধনার উপর নির্ভরশীল। তিনি পুরোপুরিভাবে সাধনা শুরু করলেন। যেকোনো সাধককে পেলেই সুভাষ দলবলসহ তাঁর পিছু নিতেন। কয়েক মাস পরে তিনি বুঝতে পারলেন যে এগুলো সব পণ্ডশ্রম, পরে আবার রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের কাছে ফিরে গেলেন। ষোলো পূর্ণ হওয়ার আগেই সুভাষ গ্রাম ও এর উন্নয়ন সম্পর্কিত বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং বুঝতে পারলেন যে ধর্মীয় জীবন বলতে এককভাবে সন্যাসী হতে হয় না; বরং মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হয়, যার মধ্যে দেশের সেবা করাকে তিনি অন্যতম মনে করতেন। কৈশোরের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সময়ে সুভাষ আত্মিক উন্নতির ক্ষেত্রে বিকোনন্দ বড়ো ভূমিকা পালন করেন, এর কারণ হলো স্বামীজীর মিশন ছিলো যৌক্তিক দর্শনের উপরে দাঁড়ানো এবং যেখানে তিনি (স্বামীজী) বিজ্ঞান ও ধর্মকে মিথস্কৃয়ায় উপস্থাপন করেছেন।

কলকাতা থেকে কটকে আগত একদল পরিব্রাজকদের কাছ থেকে সুভাষ বসু তাঁর প্রথম রাজনৈতিক আবেগ লাভ করেন। এই দলের নেতা একজন মেডিকেল ছাত্র ছিলো এবং তাদের লক্ষ্য ছিলো আত্মিক উন্নতি ও জাতীয় চেতনায় নিয়োজিত থাকা, যা সুভাষের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভাবনাকে স্পর্শ করে তাঁর আদর্শকে উজ্জীবিত করে। এই সংযোগ শেষ বছরগুলোতেও ছিলো।

মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা কাছাকাছি চলে আসলে তাঁর পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, এবং সবাই মিলে এই খামখেয়ালি পরায়ন অপ্রতিরোধ্য ছেলেকে সঠিক পথে আনতে সচেষ্ট হলেন। যাইহোক, ফল প্রকাশ হলে দেখা গেলো সুভাষ চন্দ্র সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছেন। এরপর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পরিবার তাঁকে কলকাতা পাঠালো। ভালোলাগার বিষয় হলো কলকাতার পরিবর্তিত বাস্তব পরিবেশেও সুভাষ ভালোভাবেই মানিয়ে নিলো।

 

প্রথম পর্ব
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু
লেখক: শিশির কুমার বসু
প্রকাশক: ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ভারত
অনুবাদ: মাহমুদ মিটুল

Spread the love
  • 30
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    30
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন