নতুন বই থেকে তিনটি অণুগল্প || কামরুজ্জামান কাজল

একটা বোকা পশু হয়ে বসে থাকি

 

মোছাদ্দেক হুজুর ছুরিটা নিয়ে আগাতে যাবে— পশুটি বললো থামেন । আমার মত নাই ।

বদরুল ইসলাম নিজের কুরবানির গরুর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন । ব্যাপারটা কী হলো এখনও কেউ বুঝতে পারছে না ।

গরুটিকে আবার ভালভাবে শুইয়ে, দড়ি দিয়ে চার হাত-পা বেঁধে, প্রায় দশজন লোক মিলে ধরে, একজন চোখ ঘুরিয়ে ইশারা দিলেন—হুজুর সাহেব, আরেকবার ।

মোছাদ্দেক হুজুর ছুরিটায় ধার পরখ করলেন । বিসমিল্লাহ পড়ে গরুটির কাছে যেতেই আবার একই কথা । কইছি না আমার মত নাই—পশুটি বেশ বিরক্তির সাথে কথাটা বলে ওঠে ।

এইবার সবাই একটু বিরক্ত । আরে বদরুল আঙ্কেল, আপনার নিজের কোরবানি । আবার নিজেই কন মত নাই।

বদরুল বাস্তবে যত খারাপ লোকই হন না কেনো, তার এইবারের কুরবানি আসলেই সহী নিয়াত নিয়ে করা । লোক দেখানো কাজ বহু করছেন, লোক ঠকানো কাজও তার অনেক । কিন্তু এই কোরবানির ভেতর কোনো ঝামেলা নাই । টাকাটাও হালাল । বেতন-বোনাসের ।

মোছাদ্দেক হুজুর হাত ধুয়ে বদরুলকে ডাকেন । মাহতারাম, আপনি কি কোনো কারণে চিন্তিত? আস্তাগফেরসহ একবার সুরায়ে ফাতেহা, তিনবার সুরায়ে ইখলাম আর কয়েকবার দুরূদশরীফ পাঠ করুন । পশুটি খেঁকিয়ে ওঠে— সে ঠিকঠাক সুরা টুরা পারে কিনা না জাইনাই পড়তে দিলেন হুজুর সাব!—বদরুল নিজের মুখে হাত চাপা দেয় । কী বলছে এইসব সে?

হুজুর বদরুল সাহেবের কাঁধে হাত রেখে মিস্টি করে হাসলেন । আচ্ছা আমার সাথে পড়েন । এটুকু বলার মাঝেই আবার পশুটি বলে ওঠে—থামেন, উনি যেইহারে আকাম কুকাম, চুরি বাটপারী করেন— ইমান আছে নাকি একটু জেনে নিলে ভালো হয় না?

বদরুল আর বসে থাকতে পারলেন না । মুখ ধরে দৌড়ে বাইরে চলে গেলেন । নিজের মুখ, নিজের কন্ঠ অথচ কথা বলছে একটা পশু! একটা বজ্জাত পশু!

কথাটি মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে । সাধারনত ভুলভাল গুজব ছড়ায় । প্রথম প্রথম আসল ঘটানাটা ছড়ালেও শেষ পর্যন্ত মানুষ বলাবলি করতে থাকে—বদরুল ইঞ্জিনিয়ারের কুরবানির গরু কথা কইতে পারে ।

জব্বার দারোয়ান ভীড় সামলাইতে কাহিল । সে অনেকবার করে বুঝাইছে— কোরবানীতে একটু ঝামেলা হইছে, গোশতের ভাগ বাটোয়ারা আরেকটু পরে হইবো । তোমার পরে আসো । ভিড়ের মধ্য থেকে একজন ভিখারি বলে ওঠে— আমাগো গোশত লাগত না, আমরা খালি কথা বলা পশুডারে দেখতে চাই ।

গ্রামে কুরবানির ঈদ করতে আসাটাই ভুল হয়েছে । হেটে যেতে যেতে বদরুল ভাবেন । কী বজ্জাত গ্রামবাসী । আমারে দেখতে চায়, আমি নাকি কথা বলা পশু! বদরুল হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় ।

চারিদিকে বিকট আওয়াজে হিন্দি গান বাজিয়ে ঈদের তিনদিন চলে যায় । বদরুল সাহেবের বাড়িতে কুরবানি আর দেয়া হলো না । তারচেয়ে বড় উদ্বেগের খবর বদরুল সাহেব এই তিনদিন একবারও বাড়িতে আসেন নাই ।

কী ব্যাপার বদরুল চাচা, আপনি এইখানে বসা? আমরা পুরা গ্রাম তন্ন তন্ন কইরা খুইজা মরতাছি! লোকজন দেখে বদরুল তেমন গা করে না । তাচ্ছিল্যের স্বরে একমুঠো ঘাস মুখে নিয়ে চাবাতে থাকেন । সংসারে আর মন নাই, আজকাল খুব উদাস লাগে—বদরুলের ভেতরে থাকা পশুটি আবার কথা বলে ওঠে ।

অবস্থা যখন এই, বদরুলকে বেঁধে জোর করে তুলে আনতে হলো বাড়িতে । এখন সে বাড়িতেই থাকে । নিজের ছোট মেয়েটাকে দিয়ে অনেক কস্টে বদরুল একগাছি দড়ি জোগাড় করেছে ।

দড়ির একপাশ খুঁটিতে বাধে বদরুল । আরেকপাশটা নিজের গলায় দিয়ে আনন্দে একটা হাহ—শব্দ করে বদরুলের ভেতরে থাকা পশু । যাক, এইবার নিজেকে গৃহপালিতই লাগছে ।

বিছানার পাশেই জানলা। চারহাত পায়ে বিছানার উপর দাঁড়িয়ে বদরুল অপেক্ষা করে । নিজের ভেতর পশুটি কবে যে বশ মানবে! সেইদিনই হবে তার কুরবানি ।

 

 

একটি ঐতিহাসিক গল্প

 

সে অনেককাল আগের কথা । মধুমতি নদীর তীরে শ্যামল একটা গ্রাম আলাইপুর । জমিদার কদু শেখের কাচারিঘরে একটা বিচার চলছিলো ।

একবাটি পেঁপে রেখে ঘরের চাকর যখন চলে যাচ্ছিলো, কদু শেখ আরাম কেদারা থেকে একটু ঝুঁকে একফালি পেঁপে নিয়ে বললেন– কোন গাছের পেঁপে রে ওদুদ? হ—–হুজুর এইডা উত্তর বাগানের, মিস্টি আছে না? মুখের মধ্যে পেঁপেটা দিয়ে কদু শেখ কয়েক সেকেন্ড চোখ বুঁজে—হু বলে আবার চোখ বুঁজলেন । যা আরও কয়েকখান পাইড়া নিয়ে আয় । সবাইরে ছুইল্যা দে ।

নায়েব গোমস্তা থেকে শুরু করে সাধারণ বিচার প্রার্থীদেরও উত্তর বাগানের পেঁপে খেতে দেয়া হলো । কিন্তু কেউই হাত বাড়ায় না । এইরকম পরিস্থিতিতে জমিদার সাবের এমন মশকরায় সবাই অবাক হয়!

এই তোমরা খাইতাছো না কেন? খাও খাও আমি তোমাদের বিচার কইরা দিমু । বলেই কদু শেখ কাচারি ঘর থেকে বের হয়ে যান ।

এদিকে মধুমতির জেলে থেকে শুরু করে মালপরিবাহী নৌকা-মাঝিদের ভেতরে সবসময়ই ভয়টা কাজ করত । নীল কুঠিয়াল মিস্টার রাইন গতকালও একটা নৌকাবহর আটকে দিয়েছে । বন্দী মাঝিদের দিয়ে সে চাকরের কাজ করায় । মারধর করে । আরও নানারকম অপমানজনক অত্যাচারের কথা শোনা যায় ।

অবশেষে কদু শেখ লাঠিয়াল বাহিনীর সর্দারকে ডেকে পাঠান । বিশাল নৌকাবহরে শওকত তার লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হয় । নীলকর রাইনকে শায়েস্তা করেই তবে ফিরবে ।

তিনদিন পার হলেও লাঠিয়াল বাহিনীর বহর ফেরত আসে না । কদু শেখ দীঘির পাড়ে বসে কিছু একটা ভাবছিলেন । ওদুদ এসে খবরটা দিলে— উনার ভ্রু কুঁচকে ওঠে । লাঠির যুদ্ধে কামান-পিস্তল!

যুদ্ধ আরও বাড়ত । হঠাত কদু শেখের মনে পড়লো হাইকোর্টের উকিল বন্ধুর কথা । সাথে সাথে কলকাতার উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লেন ।

প্রায় আঠারো মাস মামলা মোকদ্দমার পর বিচারক আসছে সোমবার সিদ্ধান্ত জানাবেন । কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ায় মিস্টার রাইন । তখন বাংলাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির একচেটিয়া ব্যবসা । ফলাফল কি হবে সবাই জানে ।

অন্যায় প্রমানীত হওয়ার পরেও সামাজিক অবস্থা বিচারে মিস্টার রাইনকে কারাদন্ড দিলেন না বিচারক । আদালত অর্থদন্ড দেয়াতে মিস্টার রাইন মুচকি মুচকি হাসে । উপস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির ইংরেজরা পর্যন্ত হাঁফ ছেড়ে বাঁচে ।

কুদরতউল্লাহ ওরফে কদু শেখকে বিচারক বললেন— যতটাকা ক্ষতি হয়েছে জরিমানা করুন, মিস্টার রাইন উহা পরিশোধ করতে আইনগতভাবে বাধ্য । কদু শেখ কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন । চোখ বুজে বললেন— তবে তাই হোক, জরিমানা আধা পয়সা ।

আধা পয়সা! একজন ইংরেজকে আধা পয়সা জরিমানা! তাও আবার কালা বাঙালী আদমি!— উপস্থিত সকলের কানাকানি ফিসফিসানিতে আদালত চত্ত্বরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলো । মিস্টার রাইন হঠাত ভেঙে পড়ে, কদু শেখের কাছে আকুতি জানায়—এই অপমান থেকে আপনি রক্ষা করুণ, যত টাকা লাগে আমি দেবো ।

কদু শেখ ঠান্ডা গলায় বলেন—টাকা আমি গুনি না, মাইপা রাখি । তুমি আমাগো লোকের উপর অত্যাচার করছ, আমি প্রতিশোধ লইলাম। । আমার নাম কুদরত উল্লাহ শেখ । নামডা মনে রাইখো ।

ট্রেনের মধ্যে বৃদ্ধ লোকটি গল্পটি বলা শেষ করলেন । মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এডভোকেট সাহেব । তার পাশেই চোখে চশমা, পাইপ হাতে বসে ছিলেন তাঁর বন্ধু । দুজনের মুখই হাসি হাসি ।

পাইপ হাতে থাকা সুদর্শন লোকটি বলে ওঠে, কি বুঝলা ফজলু ।
ফজলু হাসেন । তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে বলেন— দেইখো মুজিবুর, তোমার পরদাদারে নিয়া এখন যেমন সবাই গল্প করতাছে, তোমারে নিয়াও একদিন গল্প হইবো । তুমি ঠিক পথেই আছো । কদু শেখের বংশধর শেখ মুজিবুর কিছু বললেন না, কেবল নিশঃব্দে তাকিয়ে থাকলেন—দূর ঐ মধুমতীর দিকে ।

 

 

পাতিবিলের করুণ হাওয়া

 

সকাল হতে না হতে—পা ছাড়াই জুতা জোড়াটি বেরিয়ে পড়লো ।

দরজার বাইরে বের হতেই কচি পাতার ভেতর দিয়ে কয়েক ছটাক আলো এসে পড়লো জুতা জোড়ার উপর । সাদা জুতাটি কোমল আলোর দুলুনিতে হিহিহি করে হেসে ওঠে । এই দেখে পাতিবিলের উড়াল হাওয়াটি এসে কেমন একটা সুরে, কি যেনো বললো । পা ছাড়া জুতা জোড়াটি হাঁটতে শুরু করে ।

যাবে আর কোথায়? বয়েসে নতুন, সাইজও ছোট । সুতরাং জুতা জোড়াটি গিয়ে দাঁড়ালো একটি আইসক্রিমের দোকানে । একটা কোণে হেলান দিয়ে বসেছিলো ছেড়া স্যান্ডেলটি । এটিও পা ছাড়া । চোখাচোখি হতেই সাদা জুতাটি নিজের আইস্ক্রিম এগিয়ে দিয়ে বলে উঠলো—ভাই খাবি?

ছেঁড়া স্যান্ডেলটি কি বলেছিলো জানা যায় নাই । এদিকে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাদা জুতা জোড়াটি পৌছে গেলো স্টেডিয়াম মাঠে । বিশাল মাঠটায় বেশ কয়েকটা গরু ছাগল চরছিলো । যদিও ওদের রাখাল ছিলো না । তবে গলায় বাঁধা ছিলো দড়ি, আর চোখের ভেতরে নিঃস্পৃহতা দেখেই বোঝা যায় । এরা গৃহপালিত ।

মাঠের সবুজ ঘাসে প্রজাপতি ছিলো, জুতা জোড়াটির গায়ে এসে উড়ে উড়ে বসে রঙ ছড়াচ্ছিলো ঠিকই— তবুও জুতা জোড়াটির খেলাধূলায় মন নাই ।
দোলনা দুলে
পার্কে ঘুরে
হরিণ বানর কাকাতুয়া দেখে
চকলেট থেকে শুরু করে রাস্তার নানা খাবার
মোবাইলে গেইম পর্যন্ত খেলতেও অনীহা লাগে জুতা জোড়াটির । শেষমেশ মন যা বলছিলো তাই করলো— পা ছাড়া জুতাটি । যদিও শরীরের অবয়ব ছিলো না মনে । তবুও ইচ্ছের ভেতর পাখিরা ডেকে ডেকে ওঠে । কেমন জানি কর্কশ!

কালো পিচের রাস্তায় এসে যখন সাদা জুতা জোড়াটি এসে পৌছল, তখন আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে । সামনে থেকে ছুটে আসছে অসংখ্য চাকা । গাড়ি ছাড়া । ব্রেক ছাড়া । স্টেয়ারিং হেলপার ড্রাইভার কিছুই নাই ।

সাদা জুতাটি ভয় পায় না । পা ছাড়া জুতার আবার ভয় কী? সাদা ফিতার ভেতর গুঁজে রাখা আছে—সেই পাতিবিলের করুণ সুরের গান ।

এদিকে কালো পিচে রাস্তায় ঘটে গেছে আরেক কান্ড । জোড়ায় জোড়ায় হাজারে হাজারে সাদা জুতায় রাস্তাটি ভরতে থাকে । সবই পা ছাড়া । ছোট ছোট । নিঃস্পৃহ । সব জুতার ফিতাতেই একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস!

চাকা গুলো এগিয়ে আসে । বেসামাল,বেপোরায়া ভাবে । যদিও চাকার ভেতরে ছিলো না কোনো রঙের ছিটেফোটাও । তবুও সাদা ফিতা, সাদা জুতা জোড়া রঞ্জিত হতে থাকে । ছোপ ছোপ রক্তে । টাটকা ।

এদিকে একটা খালি চেয়ার বসে আছে । মানুষ ছাড়াই । হা হা করে হাসছে একটা মুখ । বেরিয়ে আছে একপাটি দাঁত, রক্তের লাল ছোপ লেগে আছে এখানেও । যদিও মুখটা মানুষের ছিলো না ।
পাতিবিলের করুণ হাওয়াটি কাঁদতে থাকে । কাঁদতেই থাকে । লন্ডভন্ড কালবৈশাখী ধেয়ে আসে এদিকে । যদিও সময় এখন বর্ষাকাল ।

 

বইঃ ভেতরে ভেতরে খেলা করে যারা 
লেখকঃ কামরুজ্জামান কাজল
প্রকাশকঃ অনুপ্রাণন 

Spread the love
  • 21
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    21
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন