বব ডিলানের কবিতা(২য় কিস্তি) || অনুবাদঃ মাহমুদ মিটুল

কিছু তো একটা

কিছু তো তোমাতে আছে মিশে যায় আমারই মাঝে-
অঙ্গের ললিত ভঙ্গি অথবা চুলের কারুসাজ?
নাকি আমার হৃদয় ধ্বনি অন্তরে তোমার বাজে?
কিছু কি এমন পার হয়ে শতাব্দী জেগেছে আজ?

বিস্ময়ে করছি স্মরণ কৈশোরের স্বপ্ন-অতীত
সবুজ লেকে বর্ষা, ভুলুত পাহাড়ে হাঁটার রীতি
ড্যনি লোপেজ-আমি, নিঝুম দৃষ্টি, কালোরাত, রুথ
কিছু তো তোমাতে আছে ফিরিয়ে আনে বিস্মৃত স্মৃতি

তোমাকে পেয়ে হঠাৎ হৃদয় উঠলো গেয়ে গান
সবকিছুর কেন্দ্র তুমিই দেখার নেই বাকি আর
মিষ্টি স্বরে পারতাম বলতে থাকবো বিশ্বস্তজন
কিন্তু তা হতো বেদনা তোমার আর মৃত্যু আমার

কিছু তো তোমাতে আছে প্রবাহিত লাবণ্য বর্ণালী
উড়ে ঘূর্ণীঝড়ে অনেক পেয়েছি আশ্রয় এখন
নিয়েছো তুলে তুমি তলোয়ারে কাটা আমার ফালি
কিছু তো তোমাতে আছে এড়াতে পারে না এই মন

 

আস্থা রাখো নিজের উপর

আস্থা রাখো নিজের উপর
আস্থা রাখো নিজের উপর করো তাই যা বলে তোমার চেতনা
আস্থা রাখো নিজের উপর
আস্থা রাখো নিজের উপর করো যা বোঝো ঠিক না করে ভাবনা
চাকচিক্য দেখেই কাউকে করো না বিশ্বাস
রঙচঙ খসে গেলে দেখবে ওসব আবর্জনা
কাউকে যদিবা হয় দরকার
আস্থা রাখো শুধু নিজের উপর

আস্থা রাখো নিজের উপর
আস্থা রাখো নিজের উপর জানতে হলে আসল পথের সন্ধান
আস্থা রাখো নিজের উপর
আস্থা রাখো নিজের উপর পেতে হলে খুঁজে দ্বিধার সমাধান
মুখের কথায় ভুলে কাউকে ভেবো না আপন
পরক্ষণেই দেখবে সবই মিথ্যে প্রলোভন
কাউকে যদিবা হয় দরকার
আস্থা রাখো শুধু নিজের উপর

তুমিই কেবল তোমার একমাত্র আপন
জগতজুড়ে চোর-বাটপার জন্তু-জানোয়ার
রেখো না অন্যতে আশা কেউ নয় স্বজন
করো না কারো চিন্তায় নিজেকে ছারখার

আস্থা রাখো নিজের উপর
হতাশা ছোঁবে না তোমাকে আঘাতে পৃথিবীর
আস্থা রাখো নিজের উপর
প্রত্যাশা করো না উত্তর যাকিছু নিরুত্তর
ভালোবাসার মায়ায় যেনো ভুলো না কখনো
হয়তো ওসব লালসামাত্র ছলনায় মোড়ানো
কাউকে যদিবা হয় দরকার
আস্থা রাখো শুধু নিজের উপর

মৃত্যু নয় সমাপ্তি

যখন তুমি একলা থাকো বিষাদ বসনে
নাই কোনো বন্ধু স্বজন পাশে দাঁড়াবার
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে
পবিত্রতায় মোড়া যাকিছু নিজস্ব তোমার
দুঃখমাঝে ডুবে গেলেও ভেঙো না তো তাল
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে
হয় না শেষ, শেষ হয় না, জীবন বিশাল
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে

চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে যখন দ্বিধাদ্ব›দ্ব মনে
বুঝতে পারো না পাবে খুঁজে কোন পথে গেলে
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে
স্বপ্ন-ফানুস উড়িয়ে দেখো হৃদয় মশাল জ্বেলে
জানো না হয়তো তুমি জড়ানো কীসের জাল
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে
হয় না শেষ, শেষ হয় না, জীবন বিশাল
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে

যখন ডোবে অন্তর তোমার মেঘের গহীনে
প্রবল তোড়ে ঝরে শুধু ঝরে বর্ষাধারা
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে
হয়তো তুমি একলা তখন নেই কারো সারা
নেই হয়তো বাড়ানো কোনো বন্ধুর আঙুল
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে
হয় না শেষ, শেষ হয় না, জীবন বিশাল
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে

জীবন বৃক্ষটা একদিন মরে
আত্মার নাই তো বিনাশ
মঙ্গল আলো ঝরে ঝরে পড়ে
উজ্জ্বল করে আঁধার আকাশ

শহরগুলো যখন জ্বলে ঘৃণার আগুনে
পুড়ে পুড়ে ছারখার সব মানুষের প্রাণ
মনে রেখো হয় না শেষ সব কিছু মরণে
কিন্তু তুমি খুঁজে হয়রান পাও না পরিত্রাণ
চেপে বসা নিয়মে নাগরিক থাকো বেশামাল
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে
হয় না শেষ, শেষ হয় না, জীবন বিশাল
মনে রেখো হয় না শেষ সবকিছু মরণে

 

প্রেমজ্বর

হেঁটে যাই আমি এক মৃত রাস্তা দিয়ে
হেঁটে যাই আমি মাথায় তোমাকে নিয়ে
পায়ের পাতারা ক্লান্ত
মগজ বড়োই শ্রান্ত
মেঘেগুলো কাঁদছে অঝোরে অসহায়।

শুনেছি কি আমি কারোবা মিথ্যে ভাষণ?
শুনেছি কি আমি কারোবা দূরে রোদন?
আমাকে তখন ঘুমঘোরে
হাসি-শেলে দিলে ধ্বংশ করে-
বলেছি সবই সহজ সরল ভাষায়।

আমি ভালোবাসার কাঙাল
রাখে আগলে যা
সেই ভালোবাসার আমি তো
হয়েছি কাঙাল।

আমি দেখি, দেখি পথে প্রেমিক-প্রেমিকা
আমি দেখি, দেখি জানালায় মরিচিকা…
দেখতে দেখতে যায় চলে
রেখে তার ছায়া
আমাকে তেমনি একা ফেলে।

আমি ভালোবাসার কাঙাল
রাখে আগলে যা
সেই ভালোবাসার আমি তো
হয়েছি কাঙাল।

অনেক সময় মৌনতা যেনো তুমুল বজ্রপাত
অনেক সময় পথিমধ্যে হয়ে যাই লুটপাট-
হবে না তুমি কখনো সত্য?
তোমাকে ভেবে আমি বিস্মিত!

আমি ভালোবাসার কাঙাল
ভাবি আসবো না সামনে তোমার
আমি ভালোবাসার কাঙাল
পন্থা খুঁজি তোমাকে ভুলে যাবার…

জানি না আসলে আমি করার আছে কী
সব ছেড়ে হলেও তোমাকেই চাইছি।

 

চন্দ্রিমা

ঋতুরা আসে যায় হৃদয় তড়পায়
কোকিলেরা গাছে গাছে শোনো গান গায়-
দেবে না দেখা এই একান্ত চন্দ্রিমায়?

সন্ধ্যায় দিন ভুলে সুঘ্রাণ ফুলে ফুলে
আকাশ নেমেছে পৃথিবীর বাহুমূলে-
দেবে না দেখা এই একান্ত চন্দ্রিমায়?

চপলা এ হাওয়া করে প্রাণ ধাওয়া
সারি সারি পাখিরা করে আসা যাওয়া-
দেবে না দেখা এই একান্ত চন্দ্রিমায়?

প্রার্থনা করি আমি শান্তি ও সম্মিলন
আমাদের হবে এক সুশান্ত আবাসন
জানি আমি ভালোই কালের গতিছন্দ
নিয়ে যাবো বহুদূরে করে নদী পার
হবে না দীর্ঘ খুব অপেক্ষা তোমার
সবকিছু হবে জানি তোমার পছন্দ

মেঘ ভেজে লালিমায় পাতারা ঝরে যায়
পাহাড়টা আছে ঢেকে গাছেরই ছায়ায়-
দেবে না দেখা এই একান্ত চন্দ্রিমায়?

মৌমাছি গুনগুন ডালে ডালে কুঞ্জন
রঙিলা বাতাসে দোলে গোলাপের বন-
দেবে না দেখা এই একান্ত চন্দ্রিমায়?

ফণিমনসায় নেমে আসে রহস্যের আবছায়া
ফুটন্ত ফুলেরা যেনো আজ তুষার-শুভ্র-কায়া
অশ্রুর এ-ধারা আমার দেখো যায় বয়ে সাগরে
আইনজীবী-ডাক্তার যতো রাধুনীরা ভারতের
এক চোরে করছে সর্বনাশ অন্য কোনো চোরের
কার জন্য এতো ভালোবাসা? শুধু আমাদের তরে

রক্তে বাড়ে স্পন্দন অশান্ত পদ চলন
প্রান্তরে ওক গাছেরা করছে ক্রন্দন-
দেবে না দেখা এই একান্ত চন্দ্রিমায়?

 

গড়াগড়ি খাওয়া

স্খলিত হয়ে গড়াগড়ি খেয়ে কেঁদেছি সারারাত
স্খলিত হয়ে গড়াগড়ি খেয়ে কেঁদেছি সারারাত
ভুল কোটে ধরেছি বাজি হয়েছে সবই বেহাত

যন্ত্রণাতে হয়ে জরজর পারিনি ঘুরে দাঁড়াতে
যন্ত্রণাতে হয়ে জরজর পারিনি ঘুরে দাঁড়াতে
চেতনা আমার আবদ্ধ ছিলো রূপের ছলনাতে

সোনালী আলোর স্পর্শে প্রকৃতি আনে লাবণ্য দিন
সোনালী আলোর স্পর্শে প্রকৃতি আনে লাবণ্য দিন
তার মাঝে নিঃস্ব আমি এক সহায় সম্বলহীন

সাধ্য মতো করেছি সবই ভুলতে স্মৃতি তোমার
সাধ্য মতো করেছি সবই ভুলতে স্মৃতি তোমার
জ্বলে পুড়ে হৃদয় আগুনে হয়েছি আরো অঙ্গার

ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে সারাটা দিবস কাল
ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে সারাটা দিবস কাল
পাইনি কোথাও কোনো আশ্রয় শুধুই বেশামাল

ছিলাম আমি শান্ত জীবনে ভাসালে তুমি সাগরে
ছিলাম আমি শান্ত জীবনে ভাসালে তুমি সাগরে
কসম কাটছি যাবো না আর কখনো কারো দ্বারে

এসেছে ফিরে বসন্ত বায়ু সবুজ কুঁড়ি আবার
এসেছে ফিরে বসন্ত বায়ু সবুজ কুঁড়ি আবার
পাষাণ নারী মন গলে না পাথর হৃদয় তার

সকাল বেলায় সূর্য ফেরে করে শুধু ঝলমল
সকাল বেলায় সূর্য ফেরে করে শুধু ঝলমল
পোড়াবে একদিন তোমাকে পুরোনো কোনো অনল

রাতের ছায়াটা ধীরে ধীরে বাড়ে নামে অন্ধকার
রাতের ছায়াটা ধীরে ধীরে বাড়ে নামে অন্ধকার
বহন করে মরা এক লাশ দিন করছি পার

ভুলে যাই চলো অতীত আমরা বিদগ্ধ যন্ত্রণা
ভুলে যাই চলো অতীত আমরা বিদগ্ধ যন্ত্রণা
নতুন করে বাঁধি চলো ঘর মুছে সকল বেদনা

স্খলিত হয়ে গড়াগড়ি খেয়ে কেঁদেছি সারারাত
স্খলিত হয়ে গড়াগড়ি খেয়ে কেঁদেছি সারারাত
ভুল পথে হেঁটেছি আমি হয়েছে সবই বেহাত

 

পরিবর্তন আসন্ন

খুঁজেছি আমি কতো দুনিয়া ঘুরে ঘুরে
মেরু থেকে মরুভ‚মি দক্ষিণ-উত্তর
দেখেছি আমি ছুটে আসছে প্রিয়া ফিরে
অদম্য তার গতি হয়েছে অগ্রসর…
অনুভবে বুঝি আসন্ন এক বদল
দুর্দিবসের সূর্যেরা যাচ্ছে অস্তাচল।

আবর্তনে প্রতিদিন ক্ষুধার যাতনা
হন্তদন্ত যন্ত্রযানে হচ্ছে সময় পার
বরণ করবো তাকে একান্ত আগ্রহে
অধীর আমি ভীষণ অপেক্ষায় তার…
অনুভবে বুঝি আসন্ন এক বদল
দুর্দিবসের সূর্যেরা যাচ্ছে অস্তাচল।

জীবনজুড়ে শুধুই ভালোবাসাবাসি
ভালোবাসা সে তো অন্ধ সবাই জানে
চাও যদি সহজ ওই শান্ত জীবন
নেমে আসো সব ছেড়ে জনতার টানে…
অনুভবে বুঝি আসন্ন এক বদল
দুর্দিবসের সূর্যেরা যাচ্ছে অস্তাচল।

ফুরিয়েছে সময়গুলো স্বপ্ন দেখার
সেই ভালো গড়ি চলো নিজেরি ভুবন
না পেলাম স্বাদ যদি লাভ কীবা বলো
কিবা হলো অধরা যদি পুরোটা স্বপন।

তুমি তো চিরন্তনের অপার মহিমা
করবে না জানি তো জ্বালিয়ে ছারখার
নিঃসহায় আমি হারিয়ে মনের দিশা
তুমি শুধু তুমিই আরাধনা আমার…
অনুভবে বুঝি আসন্ন এক বদল
দুর্দিবসের সূর্যেরা যাচ্ছে অস্তাচল।

শুনি আমি বিলি শ্যাভের গান
পড়ি জয়েসের উপন্যাস
অনেকে ডেকে বলেছে আমাকে
ও-জগতেই আমার বাস।

সবার অঢেল আছে ধন-টাকাকড়ি
আছে পোশাকের কতো রঙের বাহার
সবাই নিয়েছে তুলে বাগানের ফুল
আমার কপালে একটাও নাই আর…
অনুভবে বুঝি আসন্ন এক বদল
দুর্দিবসের সূর্যেরা যাচ্ছে অস্তাচল।

 

 

অনুবাদকের পরিচিতি

মাহমুদ মিটুল
জন্ম: ১৪ নভেম্বর ১৯৮৬ খ্রি.
বাকেরগঞ্জ, বরিশাল।
প্রকাশিত গ্রন্থ:
মুমূর্ষা ও গোঙানি (কবিতা) 
বিস্ময় মুছে দিও না (কবিতা) 
সম্পাদনা:
বিজন অশ্রুবিন্দু  (ছোটোকাগজ)

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মন্তব্য লিখুন