সদ্য প্রকাশিত বই থেকে বিলাল হোসেনের একটি রোজনামচা

বিলাল হোসেনের রোজনামচা—সম্পর্কে

সিদ্ধার্থ দত্ত

রোজনামচা বা দিনলিপি কেন পড়ে মানুষ? কী দরকারে আসে এই দিনপঞ্জীপাঠ?স্যামুয়েল পেপিস(১৬৩৩-১৭০৩) কেন বিখ্যাত হয়ে গেলেন কেবলমাত্র ডায়েরি লিখে? কেননা তাঁর ডায়েরি তৎকালীন লণ্ডনে(১৬৬৫) ছড়িয়ে পড়া মহামারী প্লেগ ও চারদিন(২রা-৬ই সেপ্টেম্বর ১৬৬৬) ধরে চলা লণ্ডন শহরকে পুড়িয়ে খাক করে দেওয়া বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের অনুপুঙ্খ বিবরণ তাঁর ডায়েরিতে ধরেছেন পেপিস।যা আজ ইতিহাসের মর্যাদা পেয়েছে।কিংবা ধরুন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি-র ‘নোটবুক’ বা পাবলো নেরুদার ‘মেমোয়্যার্স’ আমাদের কাছে আকর্ষণীয় কেন? না যে যুগ আমরা পেরিয়ে এসেছি আর কোনোদিন যাওয়া যাবে না সেখানে,দিনপঞ্জী আমাদের নিয়ে যায় সে মূহুর্তক্ষণে! চিলেকোঠায় অথবা বহুদিন বন্ধ থাকা তোরঙ্গের গর্ভান্ধকার থেকে খুঁজে পাওয়া কোনো ডায়েরি এক অপরিসীম আনন্দে মন ভরায়,দেয় আবিষ্কারের আনন্দমূর্ছনা!

রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’-র যে অংশে কবি নানান মানুষের চান করার দৃশ্যের বর্ণনা দিচ্ছেন,সে ছবি রচনার মধ্যে সেই পুরোনো কলকাতার যে স্কেচ উঠে আসে,তা আর কোনদিন ফিরে আসবে না অথচ কী আশ্চর্য চিত্রময় লিপ্যাঙ্কন।মনের ভেতর ছবি হয়ে বেঁচে আছে শতাব্দী পেরিয়ে।এও তো সেই রোজনামচাই! কবিগুরুর অজস্র চিঠিতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তাৎক্ষণিকতা, ‘হে ক্ষণিকের অতিথি’ হিসেবে নানান দৃশ্যকল্প,ছবি সে-ও সেই দিনপঞ্জীর কথাই মনে করায়। পুরোনো দিন,পুরোনো সম্পর্ক সবই ধরা থাকে প্রকৃত শিল্পীর কলমে। সে কারণেই একজন শক্তিমান লেখকের লেখা রোজনামচা বা দিনলিপি আমাদের সাগ্রহবস্তু। যে দিন চলে গেছে,যাকে ধরে রাখতে পারিনি,সে সন্ধানে ডুব দিতে পারি ইচ্ছে করলেই।মনে করতে পারি, ‘বন্ধু কী খবর বল,কতদিন দেখা হয়নি!
একারণই ‘রোজনামচা’-র বহুল প্রচার আশা করি।

 

 

সদ্য প্রকাশিত বই থেকে একটি রোজনামচা

দুখাইয়ের দুঃখ
৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ’১৫

গতকাল প্রথমবারের মত বইমেলায় গেলাম । সবাইকে জানিয়েই গেলাম । পায়ের অবস্থা ভাল না । মেলায় গিয়ে হাঁটতে হবে—এই চিন্তাতেই পা ফুলে গেছে । তাই ঠিক করলাম—কয়েকটি নির্দিষ্ট স্টলে যাব , নির্দিষ্ট মানুষের সাথেই দেখা করব ।ফোন দিলাম— দুখাই কই ?
:কই আর—মেলায় । ভাই কি আসতেছেন ?
:হ্যাঁ । ঘাসফুলে থাইকেন ।আপনাগো প্রকাশনীর বই কিনুম।
শাহাবাগে নেমেই দেখা হল— শামতান রহমান-এর সাথে । সামতান বেশ দিলখোলা ছেলে । দরাজ গলায় সাইজীর গান গায়—‘ আর কি হবে মানব জনম বসব সাধুর মেলে ।’ মিনজিরিতলা শীতকালীন কবিতা উৎসবের সঙ্গীতের দায়িত্বে আছেন । এই উৎসবের উদ্বোধনী গানটি সে গাইবে— ‘সত্য বল , সুপথে চল ওরে আমার মন’
ফোন বেজে ওঠে- দুখাইয়ের ফোন— ভাই কোন পর্যন্ত ? আমি ত ঘাসফুলে খাড়াইয়া আছি । আসেন তাড়াতাড়ি।
ভেতরে ঢুকে দেখি বিশাল জায়গা নিয়ে এবারের মেলা । কোনখান থেকে শুরু করব বুঝতে পারছিলাম না। এপার ওপার জুড়ে শুধু স্টল আর স্টল । সামতান বলল—ভাই বিসমিল্লাহ বলে শুরু করে দেন । হাঁটতে শুরু করলাম । চোখ শুধু সাইন বোর্ডে— ‘ঘাসফুল’ খুঁজি ।
মেলার বড় বৃত্তটিকে একবার ঘুরে এলাম— কত রঙবেরঙের প্রকাশনী চোখে পড়ল— ঘাসফুলের নামগন্ধ নাই । পায়ের ভেতরে ততোক্ষণে টাটানো শুরু হয়ে গেছে । কিছুটা বিরক্তও । ফোন দিলাম— দুখাই , কই আপনাদের ঘাসফুল ? আপনিই বা কোথায় ?
:ভাই , আমি একটু জরুরি কাজে বাইরে আসছি । মাঠের ঠিক মাঝখানের স্টলে চলে আসুন । ওখানেই ঘাসফুল । অমুক স্টলের ডানে , তমুক স্টলের বামে । আমি এখনি আসতেছি ।
হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি ‘ঘাস ফুল নদী’ নামে অন্য আরেকটি প্রকাশনীর সামনে ।
হাঁটতে থাকি । হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি ‘ঝিঙে ফুল’ প্রকাশনীরসামনে ।
নাই—ঘাসফুল নাই ।
ভাল করে দুচোখ ভরে মেলাটি দেখতেই পশ্চিমে দেখলাম—‘বেহেশতের ফুল’ প্রকাশনী। মনটা তিক্ত হয়ে গেল ।
এত এত প্রকাশনীর সাইনবোর্ড— দেখতে দেখতে যখন চোখ ব্যথা হয়ে গেল , ঘাড় ব্যথা হয়ে গেল সেই সময় পেছন থেকে শুনতে পাই— বিলাল ভাই , এদিকে ।
দুখাই রাজকে দেখলাম— দেখাই যায় না তাকে । আকারে ছোট হয়ে গেছে । যতবার তার সাথে দেখা হয়— আগের বারের তুলনায় মনে হয় কিছুটা কমে গেছেন । সে ঘাসফুলের স্টলে নিয়ে যেতেই আক্কেল গুড়ুম ! সাইনবোর্ড হিসেবে অন্য প্রকাশনীর নাম লেখা । ভাগ্যিস দেখা হয়েছিল— আমি যে ভাবে সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে খুঁজছিলাম কোনদিন আর ঘাসফুলকে খুঁজেই পেতাম না ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা হয়ে গেল— সা’দ রহমানের সাথে । ফিরোজ আহমেদ , প্রকাশক—মাহাদী , শামীম আরেফিন এদের সাথে দেখা হল । এলেন প্রিয় কবি সরদার ফারুক ভাই । এসেই কথার ফোয়ারা ছুটিয়ে দিলেন । আমরা অণুরাগীরা তার কথা শুনতে থাকি । মাথা নাড়তে থাকি । হাস্যকৌতুকে হা হা করে হাসতে থাকি । এইসব জায়গায় আমি অত্যন্ত মনোযোগী নীরব স্রোতা । ফোটো সেশন চলল বেশ কিছুক্ষণ ।
এই সময়ে আনোয়ারুল কবীর ভাইকে ফোন দিলাম— ভাই কই , আসবেন না ?
কবীর ভাই বললেন— কীভাবে আসব হরতাল না ?
আমি আর কিছু বললাম না । হরতাল এটা ঠিক আছে । হরতালে ভয়ঙ্কর নাশকতা হয়— পেট্রোল বোমায় ঝলছে যাওয়ারও ভয় আছে । কিন্তু যে ভাবে দলে দলে লোকজন আসছে—কারো মনে ভয় আছে বলে মনে হয় না।
ওয়ালীভাইকে ফোন দিলাম— কী রে ভাই , আমরা এখানে , আপনি কই ?
:আসতেছি ভাইজান । বেশি সময় লাগব না ।
পাক্কা দেড় ঘন্টা পর এলেন ওয়ালী ভাই । এবার অনুপ্রাণন থেকে বেরিয়েছে তার দুর্দান্ত প্রচ্ছদের কবিতার বই— ‘বিনত খশড়া’।
এই ফাঁকে হঠাত শামীম আরেফিন এসে বললেন— ভাই , জীবনের প্রথম সাক্ষাৎকার দিয়ে এলাম ।
:মানে?
:প্রথম কবিতার বইয়ের লেখক হিসেবে নিউজ এইজ আমার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছে ।
মানুষ থেকে কিনলাম— সরদারফারুক ভাইয়ের বই—‘ দূরের জংশন’ ।অনুপ্রাণন থেকে প্রকাশিত হয়েছে — ‘অন্যদের তর্কে ঢুকে পড়ি’ । বইটি পাই নি ।
সবাই যখন আড্ডায় মশগুল দুখাই কে বললাম— দুখাই , আপনার কি অবস্থা? অনেক কাজ করছেন বুঝতে পারছি , শুকাইয়া পাটখড়ি হয়ে গেছেন ।
দুখাই হাসে , ওর মাথার পেছনে চুলের ঝুঁটি বাঁধা মেয়েদের মতো । কিছুক্ষণ পর পর সে ঝুঁটিতে হাত দেয় ।
:দুখাই ভাই , বিয়া করবেন না ?
দুখাই হেসে ঝুঁটিতে হাত দিয়ে বলল— আব্বায় কইলে বিয়া করুম ।
:আব্বায় কইতে হবে কেন ? বিয়ার বয়স ত কম হল না— কি কন ? আর শরীর স্বাস্থ্যও ত দিনে দিনে খারাপের পথে । এখন শরীরের ওজন কত ?
শরীরের ওজন ঠিকই আছে ভাই । ৪৯ কেজি ।
:মাত্র ৪৯ ! বলেন কি ? হাইট কত ?
:৫ ফুট ৫ ইঞ্চি ।
:আপনার ওজন হওয়া উচিত ৬৫ । এখনও ১১ কেজি কম । আপনি ভাই ওজন বাড়ান । আপনার হাত পা গুলি কঞ্চির মত চিকন চিকন । মাথাটাও কেমন চড়ুই পাখির মত হয়ে গেছে । আর মুখে দাঁড়ি রাখছেন কেন দুখাই ভাই ?— শজারুর কাঁটার মত কেমন খাড়াইয়া আছে । আর তাড়াতাড়ি বিয়া করেন ।
আমার কথায় শামীম বা ফিরোজ বা মাহদী হলে রেগে যেত কিন্তু দুখাই রাগবে না— জানি । সে লাজুক হেসে ঝুঁটিতে হাত দিয়ে আবার বলল— ভাই , আব্বায় কইলেই বিয়াডা কইরা ফালামু ।
: বুঝলাম না—আব্বায় কইতে হবে কেন ? আপনার নিজের কোন গরজ নাই ?
:গরজ নাই আবার ? আমিই না জানি কি গরজে আমার দিন রাত কাটে ।
:তাইলে বললেন যে আব্বায় কইতে হবে ?
:বউরে খাওয়ামু কি । আব্বায়ই ত খাওয়াইব । আমি ত কিছু করি না ।
:বুঝলাম । এই কথাটাই আব্বারে গিয়া কন । বলেন— আব্বা , বিয়া করুম ।খাওয়াইবা তুমি ।
:বলছি ত ভাই । বলতে বলতে মুখে ফেনা তুইলা ফেলছি । শেষে আমার সেগুন কাঠের খাটটা কুড়াল দিয়া কুপাইয়া দুইভাগ কইরা কুমিল্লা থেকে ঢাকায় চইলা আসছি ।

 

 

বই সংগ্রহ করতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন এই ঠিকানায়—
অনুপ্রাণন প্রকাশন
বি-৬৩-৬৪ কনকর্ড এম্পেরিয়াল শপিং কমপ্লেক্স
এলিফেন্ট রোড , কাঁটাবন ,ঢাকা
বিকাশ করে নিতে চাইলে—০১৯১৯৫২০৪৭৩ / ০১৮২৬০৩৩১৬১

Spread the love
  • 19
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    19
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন