“ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল” নতুন বই থেকে কবিতা || শুভ্র সরকার

অভাব

বাবা ভাল আঁকতে পারতেন। তিনি একটা কাঠের সরোদ এঁকে দিলে আমরা সবাই মিলে গান শুনতাম।
একবার ঈদে বাবা আমায় একটা জামা এঁকে দিয়েছিলেন। আমি সারাদিন সেই জামা গায় দিয়ে শহর ঘুরেছিলাম। মা একটা কাঁসার থালা এনে রাখলে বাবার আঁকার খাতায় তা পেরিয়ে যেত গোটা একটা শাদা পৃষ্ঠা। মা ভাত রান্নার জন্য চোখের দামে চুলো কিনে আনলে, বাবাও দরদ ভ’রে জ্যোৎস্নার মতো ভাত আঁকতেন।

আমার ক্ষুধা লাগলে বলতাম বাবা, একটা ক্ষুধা আঁকুন।
বাবা আমায় মা’য়ের মুখ এঁকে দিতেন।

 

কয়েকটা ফড়িঙ রোদ

প্লাটফর্মে একা ট্রেন—যেন দাঁড়িয়ে থাকা আলপথ
তাকে ধরে ফিরে আসে তোমার বুকের হিরায়েথ,
ইঞ্জিন জুড়ে শব্দের ক্যালিগ্রাফি, জানে— ব্রীজের ছায়ার নিচে
নদীও জল দিয়ে বানানো কোন সাঁকো, যেমন তুমিও…

ছুঁয়ে দিলে, কী ভীষণ হয়ে ওঠো যোগাযোগ!
পরিত্যক্ত চটিজুতো থেকে যেন অবিচ্ছিন্ন তাকিয়ে থাকে
…পায়ের দাগ

চিরহরিৎ শেমিজের ভিতর অকসর কয়েকটা ফড়িঙ রোদ

পেরিয়ে যায় তোমার বয়ঃসন্ধির নাকফুল।

 

 

ধুপছায়া

কার শরৎ রঙের ত্বকে বড়ই ফুলের মতো তুমি ফোটো। কার ছায়ায় তুমি নুয়ে পড়ো— চোখের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকো। কার দহলিজে গেয়ে ওঠো মনস্তাপ; রেণুর মতো ঝ’রে পড়ো। যেন ছুঁয়ে দিলে ভাঙচুর হয়ে যাবে তুমি। ডাক দিলে হয়ে যাবে মোহবশ নদী। আমার ভেতর যতদূর তুমি— পাখোয়াজ ভর্তি বিষণ্ণ সুর। আমি বহুদিন আমাকে খুঁজে পাই না; খুঁজে পাই নির্জনদূর। যেন কাছে এলে ম্লান হয়ে যায় যতো আড়াল। দূরে গেলে চোখে এসে দাঁড়ায় বর্ষাকাল। মন্দ্রিত হাওয়ার অবয়বে ফিরে ফিরে আসো, যতটা জাদুকরী ঘ্রান। তোমার আলোকচ্ছটায় নিহিত ধুপছায়া; মুছে দেবে সমস্ত অইরান।

 

 

এক রাষ্ট্র মেঘ

চোখ খুললেই মেঘ হয়ে যায় সমগ্র পাখিশাস্ত্র…
আকাশ মুখস্থ করতে— জানতে হয় মেঘ, পাখি এবং আঙুলের জীবন।
ক্লাসঘরে, কে যেন একবার চিৎকার ক’রে বলেছিল—
অন্তত একটা জানলা থাকা উচিত ছিল
পৃথিবীর গায়…

সমস্ত স্কুল সেদিন ফিরে গিয়েছিল মেঘেদের ডাকবাক্সে
আর তাকে পাখি ভেবে কেউ কেউ খাঁচা কিনে এনেছিল;

খাঁচা
এবং
জানলার
মধ্যে
পার্থক্য
শুধু
রাষ্ট্রবিজ্ঞান

সঙ্গম মুহূর্তে তবুও বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত জানলা
আকাশে বিঁধে যায় আঙুল গুনে মুখস্থ মেঘেরা।

অথচ খাঁচার মধ্যে কে যেন খুলে বসে থাকে—
এক রাষ্ট্র মেঘ।

 

মা

উনুনের আঁচে একা হয়ে যাচ্ছে শীতকাল…

 

 

কয়েক দৈর্ঘের জীবন

নদীর গালের টোল পার হলে আমাদের বাড়ি। যেখানে জল আর জালের পার্থক্য জানতে কেউ কেউ বেছে নেয় মাছের জীবন। কারো কারো বাড়ির ভিতর আছড়ে পড়ে পাখিদের পাহাড় ভ্রমণের দুপুর। ইথারে শুকাতে দেওয়া শৈশব- মাড়ভাঙা কাপড়ের মত খুলে দেখে ডাকনাম। চৈত্রের মাঝপুকুর অতটাও কী জানে নদীর সাঁতার যতটা জানে সেতারের আঙুল, সুরের রাইঘ্রাণ ফুটে উঠলে পাশেরবাড়ি থেকে মেহেরুণের বয়স নেমে আসে যিশুর কোমর পর্যন্ত। যেখানে পাখির ঠোঁট বুনে দেয় দুপুরের ক্যাম্প। জানলার গ্রীল খোপা করা মেহেরুণের পিঠে ধুয়ে দেয় রোদের অভিনিবেশ। শীতকাল প্রথম ঋতুস্রাবের স্মৃতির মতো বিস্তীর্ণ, সেখানে। যার ভিতর ধ্বনিত হয় আযানের সুর। হাওয়া যেন এক অবৈতনিক ঘুড়ি। ওড়ার দৃশ্য থেকে নদী শিখে নেয় পাখিদের মিমিক্রি। জলের পাঁজরে বিদ্ধ হয় মাছরাঙার মনোযোগ। সেখানে ঘুম ভাঙলে ফুরিয়ে যায় কয়েক দৈর্ঘ্যের জীবন।

 

 

শেমিজের নুন

ঘ্রাণের কাছে বিক্রি হয়ে যায় ফুলের বিবাহিত জীবন। কারো বুকের নিচে বিঁধে থাকে শোবারঘর। সূঁচের ব্যথায় কিছু আঙুল আজন্ম সেলাই করে সম্পর্ক।
অসুখী ঘামের ছায়াজনিত ধাঁধাঁর কাছে মলিন বকুল দিনের স্বর। কথাবনে জিরিয়ে নেয় নির্বোধ নাকফুল। অপেক্ষা অব্দি মধ্যাহ্ন। ঘাম পোহায় অভ্যস্ত শেমিজের নুন।
যেন ঘরে ফেরা মধ্যাহ্ন রপ্ত করে তোমার প্রসূতিবেলা।

 

 

মানুষের শব্দার্থ

ফুলফোটার শব্দ, জামার বোতামেঘরে লুকিয়ে রাখো। মুখস্থ অঙ্কের মতো আমি ভুলে যাই মানুষের শব্দার্থ। সন্ধ্যাঝোপে ধ্বনিত হয় অভিজ্ঞ অন্ধকার— দিগন্তরেখায় চেয়ে থাকে মেঘধুলো। অনভ্যস্ততায় বিদার হয়ে যায়— ধুলোর স্নান; পাখির বাগান। যেমন পালকের অবয়বে হারিয়ে যায় উড়ান। অলীক হাওয়ার তোড়ে হারিয়ে ফেলি আত্মার ঘ্রাণ। নিলীন ধুলোর অবয়বে উড়িয়ে দিলে পথের নিশানা; দীর্ঘকাল হেঁটেও মানুষ নিজের কাছে পৌঁছতে পারে না।

 

 

পৃথিবী বিক্রেতা

এরপর, অনধীত সমগ্র বর্ষার পতনধ্বনিতে— পৃথিবী বিক্রেতার ঘুমসংক্রান্ত দুঃস্বপ্ন বিচ্ছুরিত হয়ে পড়ে চতুর্দিক।
দেখো, মানুষগুলো তলিয়ে যাচ্ছে ঘুমঘুম সওগাতে।

মা’র ঘুম থেকে উঠে আসা হাঁসের পালকাবৃত পথের পাশে— তুমি একটা স্নান রেখে গেছো। পৃথিবী বিক্রেতার জন্য রেখে গেছো— শেকড়।
দেখো, রৌদ্রপ্রখর এই নির্জন জলাশয়ে শেকড় ছড়িয়ে আছে সূর্যাস্ত। আর তোমার বুকের বাঁ-পাশে সব আলো নিয়ে তলিয়ে যাচ্ছি আমি— একজন পৃথিবী বিক্রেতা।

 

 

উঠে রিকশা হুড নামিয়ে তুমি ভিজছো

উঠে রিকশা হুড নামিয়ে তুমি ভিজছো
খুব সর্দি জ্বর বাঁধিয়ে বাড়ি ফিরছো
এই বৃষ্টি আজ তোমাকে রাখে জড়িয়ে
তুমি ঠিকানা ভুলে রাস্তা ফেলি হারিয়ে
যেন নৌকায় একা বাইছি জল গুনছি
ভোর ছাড়িয়ে দিক হারিয়ে শুধু ভাসছি
ছিঁড়ে হাওয়া নীচু গাছটা পাড়ে দাঁড়িয়ে
জুড়ে রেডিও ঝরে বকুল যাই পেরিয়ে
পাখি তোমার ঝিম পোহায় লাল গোলাপে
ঢেউ ভাঙছে আমি ভাঙছি নিভু আলাপে

Spread the love
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন