ভাতিজার চোখে ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু’।।অনুবাদঃ মাহমুদ মিটুল(২য় পর্ব)

 কলেজ জীবন (১৯১৩-১৯১৯)

 

সুভাষের কলকাতা গমন থেকে তাঁর পরিবার তেমন কিছু প্রত্যাশা করেনি। মফস্বল থেকে আসা এক তরুণ ছাত্রের কাছে কলকাতা শহর তেমন কোনো সুখকর পরিবর্তন বয়ে আনেনি। এ-শহর মূলত উদিয়মান তারুণ্য ধ্বংশের জায়গা। যাহোক, সুভাষ চন্দ্র তাঁর মনের কোঠরে কিছু আদর্শ ও ধারণা গেঁথে নিয়ে কলকাতা এসেছিলো। তিনি সিদ্বান্ত নিয়েছিলেন তথাকথিত পথে না হেঁটে আত্মিক উৎকর্ষের মাধ্যমে নিজস্ব পথ সৃষ্টি করবেন এবং অন্যদের সে পথে উঠিয়ে আনবেন। তিনি এরই মধ্যে জীবনকে গুরুত্বসহকারে নিতে শিখেছিলেন এবং কলেজ জীবনে প্রবেশ করে তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে মানুষের জীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্য রয়েছে।

সুভাষ ১৯১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রধান কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন। কলেজ খোলার পূর্বে তিনি সময় নষ্ট না করে একদল আদর্শিক গুপ্তচরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করেন, যাঁদের সাথে বছরখানেক আগে কটকে তাঁর সাক্ষাত হয়েছিলো। কলেজে নতুন অভিজাত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরগাছা এবং আঁতেল পড়–য়া গ্রুপের বাইরেও একটা গ্রুপ ছিলো যাঁরা রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের অনুসারী ছিলো। সুভাষ এই গ্রুপের সদস্য ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরাই গোপন বিপ্লবী দলে পরিণত হন।

কটক ত্যাগ করা পর্যন্ত সুভাষের জীবন সম্পর্কে ধারণা অস্বচ্ছ ছিলো।  তিনি আত্মিক তাগিদ ও সমাজ সেবার অস্পষ্ট ধারণা পোষণ করতেন। কিন্তু কলকাতা এসে তিনি শিখলেন যে সমাজ সেবা যোগী জীবনের একটা অংশ এবং তা আধুনিক মানদ-ে জাতীর বিনির্মাণ। সুভাষের গ্রুপের লোকজনের নতুন সদস্য সংগ্রহের প্রতি কোনো আগ্রহ ছিলো না। এরচেয়ে তাঁরা বিশিষ্ট্য ব্যক্তিবর্গের সাথে যোগাযোগ এবং ঐতিহাসিক ও তীর্থস্থানসমূহ ভ্রমণের মাধ্যমে প্রেরণা ও জ্ঞানার্জনের দিকে বেশি মনোযোগী ছিলো। যে নেতা তাদের স্বপ্ন-কল্পনায় আসন দখল করেছিলেন তিনি হলেন আরবিন্দ ঘোষ। তাঁর যে বিষয়টি সুভাষ ও তাঁর দলকে আকর্ষণ করেছিলো, তাহলো অন্যান্য নেতারা যেখানে সাম্রাজ্যবাদী শাসনে তৃপ্ত থেকেছে, সেখানে অরবিন্দ ঘোষ ভিন্ন মত পোষণ করে স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছিলেন। তাঁর (অরবিন্দ ঘোষ) সঙ্গী হিসেবে লোকমান্য বল গঙ্গাধর তিলকও সুভাষদের কাছে পূজনীয় হয়ে উঠেছিলো। তখন একটি গুজব উঠেছিলো যে অরবিন্দ ঘোষ ধ্যান সাধনার জন্য প-িচেরি চলে গেছেন এবং বারো বছর সাধনা করে আলোকিত মানুষ হয়ে ভারতের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করে তবেই ফিরবেন। যাহোক, সুভাষের কাছে অরবিন্দ ঘোষ সম্পর্কিত এই রাহস্যিকতার চেয়ে তাঁর লেখা ও দর্শন এবং যোগসাধনার সমন্বয় সম্পর্কে তাঁর মতামত অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

দীর্ঘ বয়স পর্যন্ত রাজনীতি সুভাষকে সরাসরি আকর্ষণ করেনি। তিনি তখন বিভিন্ন ধর্মগুরুদের সাথে সাক্ষাত করতেন এবং নানান সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। কলেজে তিনি পড়াশুনায় অমনোযোগী ছিলেন, কারণ ক্লাশের বেশিরভাগ লেকচারই তাঁর কাছে আকর্ষণহীন ছিলো। পড়াশুনার চেয়ে বরং তিনি বিতর্ক অনুষ্ঠান আয়োজন, বন্যা বা দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ, শিক্ষাসফর আয়োজন ইত্যাদি কাজে বেশি মনোযোগী ছিলেন। এসব কর্মকাণ্ড  তাঁকে তাঁর অন্তর্মুখী স্বভাব থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করেছিলো। তিনি দিনদিন সমাজ ব্যবস্থার অসাম্য বা পক্ষপাতিত্বের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠেছিলেন।  যেখানে একদল ফুলে ফেঁপে উঠছিলো আর অন্যদিকে একদল ক্রমাগত দারিদ্রের কড়াল গ্রাসে নিমজ্জিত হচ্ছিল। এই সচেতনতাই তাঁকে সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একজন বিপ্লবী করে তুলেছিলো এবং সমাজের মৌলিক বিষয়বস্তু নিয়ে গভীরভাবে ভাবনায় তাড়িত করেছিলো। কটকে এক ছুটি কাটাতে গিয়ে প্রথম তিনি ভারতের গ্রামাঞ্চলের বাস্তব চরিত্রের মুখোমুখি হন। সেখানে তিনি একদল ছেলেদের সাথে কলেরা আক্রান্তদের জন্য কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন বাধার সম্মুখিন হন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “এক সপ্তাহের অভিজ্ঞতায় আমার সামনে এক নতুন পৃথিবী উন্মোচিত হয়েছিলো এবং ভারতের, বিশেষ করে গ্রামগুলোর চিত্র আমার সামনে দৃশ্যমান হয়েছিলো। যেখানে সারা ভূখ-জুড়ে দারিদ্রতায় আচ্ছন্ন, মাছির মতো মানুষ মারা যাচ্ছে। এর নিরক্ষরতা যেখানে সতত রিাজমান।”

কটকে স্কুল জীবনের শেষ দিনগুলোর মতো কলকাতায় কলেজ জীবনের প্রথম দিকেও সুভাষ সাধুদের খুঁজে বেড়ানো অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো জীবনে একজন গুরু খুঁজে বের করা। তিনি সন্যাসী বা তপস্বীদের সাথে দেখা করার জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, যাদের সহজ সরল জীবন ধারা ও উচ্চমার্গীয় চিন্তা-চেতনা তাঁকে মুগ্ধ করেছিলো। শেষ পর্যন্ত ১৯১৪ সালের গ্রীষ্মের ছুটিতে কাউকে না বলে তিনি এক সাধুর সাথে ঘর ছেড়ে চলে যান। তাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন তীর্থস্থান, ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে বেড়ান। তাঁরা অসংখ্য আশ্রমে যান এবং সাধুদের সাথে সাক্ষাত করেন। যে বিষয়টি সুভাষকে আশাহত করেছে তাহলো, এসব জায়গায় হিন্দু ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলোর চেয়ে কুসংস্কার ও অর্থহীন আচার পালন। তরুণ সুভাষ চন্দ্র এসব পবিত্র জায়গায় বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অনুশীলন দেখে ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই সফরকালে তিনি বেনারশের রামকৃষ্ণ মিশনে স্বামী ব্রহ্মানন্দের সাথে দেখা করেন, যিনি তাঁর পরিবার সম্বন্ধে ভালোভাবে অবগত ছিলেন। এমনসব মানুষজনের সাথে আলাপচারিতা এবং তথাকথিত যোগী ও তীর্থস্থানকে চাক্ষুস করার ফলে তাঁর নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসে একধরনের ভারসাম্য এসেছিলো। এদিকে তাঁর হঠাৎ করে উধাও হওয়ার ঘটনায় পিতামাতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কয়েক সপ্তাহ ধরে বেশ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটান। অবশেষে তিনি যেমন নিঃশব্দে বাড়ি ছেড়েছিলেন তেমন শান্তভাবে একদিন ফিরে আসেন। এর কিছু দিন পরেই তিনি টাইফয়েড-এ আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। তিনি বিছানায় থাকা কালীন সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

কলকাতার তৎকালীন ছাত্রদের মধ্যে স্বদেশী আন্দোলন প্রসার লাভ করলেও তখন পর্যন্ত সুভাষের জীবনে রাজনীতি তেমনভাবে প্রবেশ করেনি। তখনো তিনি আত্মিক মুক্তি এবং অরাজনৈতিকভাবে জাতি গঠনে বিশ্বাসী ছিলেন। এর মূখ্য কারণ ছিলো কলকাতা থেকে দূরে এক মফস্বল শহর কটকে ব্রিটিশ শাসন-নিপীড়ন অতোটা প্রতিয়মান ছিলো না। কিন্তু কলকাতার চিত্র ছিলো এমন যে সেখানে ব্রিটিশ শাসকরা শাসনের নামে ভারতীয়দের পদে পদে লাঞ্চিত ও বঞ্চিত করতো। রাস্তাঘাট, রেল, গণপরিবহনসহ সর্বত্র তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও জাতিগত বৈষম্য প্রদর্শন করতো। এমনকি সমাজে গণ্যমান্য ভারতীয় ব্যক্তিবর্গও তাদের এরূপ আচরণ থেকে রেহাই পেতো না। এমন জাতিগত দ্বন্দ্বে ভারতীয়দের পক্ষে কোনো আইনও ছিলো না। সাধারণ অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিলো যে ইংরেজরা সব বিষয়ে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করেছিলো। এসব অভিজ্ঞতা সুভাষের মনে সচেতনতা সৃষ্টি করেছিলো। যদিও তাঁর চিন্তার প্রসারে ওগুলোই যথেষ্ট ছিলো না। সেজন্য দরকার ছিলো পৃথিবীব্যাপী চলমান রাজনীতির জ্ঞান। পত্রিকার নানাবিধ সংবাদ পাঠ করতে করতে তিনি তাঁর বিশ্বাস ও উপলব্ধিগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সারমর্মে পৌঁছলেন, “একটা জাতিকে ভিন্ন ভিন্ন অংশে বিভক্ত করা যায় না। এমন হতে পারে না যে এক অংশ আমাদের (ভারতীয়দের) জন্য রেখে অন্য অংশ বিদেশীদের জন্য ছেড়ে দিলাম। ভারত যদি আধুনিক সভ্য জাতি হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই ভারতীয়দের সেভাবে কাজ করতে হবে এবং সামগ্রীকভাবে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হবে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার মানে হলো সামগ্রীক স্বাধীনতা এবং আরো কথা হলো, একটা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য অবশ্যই নিজস্ব সেনাশক্তি থাকতে হবে।”

কলেজ জীবনের পরবর্তী দুবছরে সুভাষের দার্শনিক ও রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটলো। এককথায় তিনি আমূল বদলে গেলেন। বেশিরভাগ সময় তিনি তাঁর দলের সদস্যদের সাথে কাটাতেন এবং দলের সদস্য সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের গুণগত মানও বেড়ে চললো। পাঠ্যপুস্তকে অমনোযোগী হয়ে পড়লেন। ফলে ১৯১৫ সালের ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষায় ভালো ফলাফল লাভে তিনি ব্যর্থ হলেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি দর্শন বিষয়টি বেছে নিলেন এবং নিজেকে সারাক্ষণ পড়াশুনায় ডুবিয়ে রাখতেন। দর্শন পাঠ তাঁকে বৌদ্ধিক শৃঙ্খলা এবং বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছিলো। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একজন সত্যিকারের মুক্তমনা যুক্তি-প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করতে পারে না।

১৯১৬ সালের প্রথম দিকে প্রেসিডেন্সি কলেজের দুটি ঘটনা সুভাষ চন্দ্রের জীবনের গতি সম্পূর্ণ পাল্টে দিলো। জানুয়ারির এক সকালবেলা শ্রেণিকক্ষের সামনে কিছু ছাত্র শোরগোল করলে বিরক্ত হয়ে প্রফেসর ই.এফ. ওটেন তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন। ফলে ছাত্ররা ধর্মঘট করে বসে। তখনকার সময়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ধর্মঘট করার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারতো না। এই ধর্মঘটের অন্যতম নেতা হওয়ায় সুভাষকে সতর্ক করা হলেও তিনি প্রতিবাদে অনড় ছিলেন। যদিও ওই প্রফেসর আন্তরিকতা প্রদর্শন পূর্বক বিষয়টি মীমাংসা করেন। কিন্তু অধ্যক্ষ তাঁর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে সরে আসতে চাইলেন না এবং ছাত্রদের জরিমানা করলেন।

পরবর্তী মাসে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। কিছু শিক্ষক ফের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করলো। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-কানুনে প্রতিবাদ-ঘর্মঘট অর্থহীন দেখে কিছু ছাত্র আইন নিজেদের হাতে তুলে নিলো। অধ্যাপক ওটেনকে নিদারূণভাবে পেটানো হলো। এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে সুভাষ দেখলেন যে ছাত্ররা অধ্যাপককে সমুচিত জবাব দিয়েছে।

সরকার তৎক্ষণাৎ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষণা করলো এবং চলমান অস্থিরতা নিরসনে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। অধ্যক্ষকে পদচ্যুত করে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। অধ্যক্ষ দায়িত্ব হস্তান্তরের পূর্বে সুভাষসহ সব ছাত্রদের কালো তালিকাভুক্ত করেন। তিনি সুভাষকে ডেকে এই বলে ধমকান, “বসু, তুমি এই কলেজের সবচেয়ে উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র। আমি তোমাকে বরখাস্ত করলাম।” সুভাষ ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়িতে চলে গেলেন। পরিচালনা পর্ষদও অধ্যক্ষের আদেশকে অনুমোদন দিয়ে সুভাষকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অন্যত্র পড়াশুনার অনুমতি চাইলে সেখানেও প্রত্যাখ্যাত হন। ফলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চূড়ান্তভাবেই বহিষ্কৃত হলেন।

তদন্ত কমিটিতে ছিলো তিনজন ব্রিটিশ ও দুইজন ভারতীয়-  আসুতোষ মুখার্জী ও হেরাম্বা চন্দ্র মৈত্র। ছাত্রদের পক্ষে সুভাষ কমিটির সামনে বিষয়টি উপস্থাপন করেন। তিনি খোলাখুলিভাবে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরে বলেন যে, যদিও শারীরিক আঘাতকে তিনি সঠিক মনে করছেন না, তবে ছাত্ররা কাজটি করেছে কিছু উসকানির কারণে। প্রেসিডেন্সি কলেজে ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশদের অসদাচরণ প্রদর্শনের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। কিন্তু কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, এক শব্দও ছাত্রদের পক্ষে লেখা হয়নি এবং একমাত্র সুভাষ বসুকেই বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে তাঁর আর কিছু করার ছিলো না।

এই সময়ে কলকাতার রাজনৈতিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। বহুলোককে গ্রেফতার করা হয়; তাদের মধ্যে প্রেসিডেন্সি কলেজের বহিষ্কৃত ছাত্ররাও ছিলো। ফলে সুভাষের পরিবার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাঁকে কটকে পাঠিয়ে দেয়াই সমীচীন মনে করলো।

নিজের কৃতকর্ম নিয়ে সুভাষের মনে কোনো অনুশোচনা ছিলো না। বরং জাতীয় সম্মান রক্ষার্থে নিজের বিসর্জনে তিনি আনন্দ ও তৃপ্তি বোধ করলেন। তাৎক্ষনিকভাবে তিনিও ওই মর্মান্তিক ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি। আসলে তো কলেজ থেকে বহিষ্কারের ঘটনাই তাঁর পরবর্তী জীবনের দিক নির্ধারণ করে দিয়েছে। তিনি নতুন উদ্যমে সংকট মোকাবেলা ও দায়িত্ব পালন শুরু করলেন। এসব কিছু তাঁকে আত্মপ্রত্যয়ে বলিয়ান হয়ে সামনে এগিয়ে যাবার পদক্ষেপ গ্রহণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। আরও বলা যায় যে, এই প্রথম তিনি তাঁর চরিত্রে নেতৃত্ব দানের বলিষ্ঠ ক্ষমতার খোঁজ পেলেন।

অধ্যাপক ওটেন-এর ঘটনাটা সুভাষের জীবনে ঝড়ের মতো বয়ে গেলো এবং তাঁর ভিতরের সত্ত্বাটাকে ওলট-পালট করে দিলো। পিতা-মাতা ও পরিজন তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলো বলে তিনি বেশ স্বস্তি বোধ করেন। ফলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান এই ভেবে যে তিনি যা করেছেন তা সঠিক ছিলো। উল্টোদিকে তিনি যাদের সঙ্গে কাজ করতেন সেই দলের লোকজন মনে করলো যে সুভাষ তাঁর আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি হারিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি ছিলেন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। এ সময় তাঁর স্বভাবের লাজুকতা অনেকখানি দূর হলো।

ভবিষ্যতে পড়াশুনার কোনো আশা না থাকায় সুভাষ পুনরায় সমাজ উন্নয়নমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি অনুধাবন করলেন যে ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী কাজের গুরুত্ব অনেক। তাই যতোই বাধা বিপত্তি এসেছে এ ধরনের কাজ থেকে তিনি কখনো পিছু হটে আসেননি। যুবকদের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে তিনি যুব সংগঠন গড়ে তোলেন। সমাজে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে প্রচার কার্য পরিচালনা করেন। একবার অসুস্থ এক সাঁওতাল ছাত্রকে সেবা করতে সাম্প্রদায়িক কারণে কেউ এগিয়ে আসলো না। কিন্তু এই কাজের দায়িত্ব তাঁর মা নিলে সুভাষ চন্দ্র অত্যন্ত আনন্দিত হন। তিনি আবার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তীর্থস্থান দর্শনের উদ্দেশ্যে বন্ধুদের নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হলেন। পূজা ও ধর্মীয় অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনে অংশগ্রহণ করলেন। এই সময় তিনি আত্মানুসন্ধান করতে শুরু করলেন যা আগে কখনো করেননি। প্রথমত, নিজেকে জানা এবং নিজের অবচেতনের বিভ্রান্ত স্বপ্ন বা আকাক্সক্ষাগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন। এক বছর অতিবাহিত করে তিনি কলকাতায় ফিরলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় ভর্তির চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলো ভিন্ন কিছু। অতঃপর তিনি ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের চেষ্টা করলেন। কিন্তু চোখের সমস্যার কারণে তিনি অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। এমতাবস্থায়, তিনি জানতে পারলেন যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর শাস্তি মওকুফ করে অন্য যেকোনো কলেজে ভর্তির অনুমোদন দিয়েছে। তিনি সরাসরি স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যক্ষ ড. আরকুহার্ট-এর সাথে দেখা করে দর্শন শাস্ত্রে অনার্স কোর্সে অংশগ্রহণের আবেদন জানান। অধ্যক্ষ আরকুহার্ট আবেদন গ্রহণ করলেন এবং তাঁর প্রাক্তন কলেজের অধ্যক্ষের কাছ থেকে কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে বললেন। তাঁর ভাই শরৎ বসু ভর্তি কাজে সহযোগিতা করলেন এবং ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হলেন। এখানে ভর্তি হয়ে সুভাষ চন্দ্র দেখলেন যে মি. আরকুহার্ট শুধুমাত্র একজন চমৎকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষই নন, তিনি দর্শন শাস্ত্রের একজন সুদক্ষ পণ্ডিতও বটে।

১৯১৬ সালে সুভাষ চন্দ্রের বেঙ্গল রেজিমেন্ট করপস এর একজন অবসরপ্রাপ্ত অফিসারের সাথে দেখা হয়, যাকে বিশ্বযুদ্ধ চলা কালে মেসোপটেমিয়ায় পাঠানো হয়েছিলো এবং তিনি অনেকদিন তুরস্কের জেলে কাটিয়েছেন। ওই অফিসারের কাছ থেকে নানা চাঞ্চল্যকর গল্প শুনে সুভাষ বসু সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে চাইলেন। ভারত সরকার ইন্ডিয়ান ডিফেন্স ফোর্স বা টেরিটোরিয়াল আর্মিতে একটা ইউনিভার্সিটি ইউনিট রাখার ব্যাপারে সম্মত হয়। সাধারণ সেনা ভর্তি পরীক্ষার মতো ওই পরীক্ষাগুলো অতো কঠোর ছিলো না এবং সুভাষ চন্দ্র সহজেই যোগদান করতে পারলেন। এই কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে এক নতুন মাত্র যোগ করলো। একজন রগচটা স্কটিশ ক্যাপ্টেন গ্রে ছিলো তাঁর প্রশিক্ষক। শুরুতে ফোর্ট উইলিয়ামের স্টাফ অফিসার ভেবেছিলো যে বাঙালি ছেলেরা শেষপর্যন্ত সেনা সদস্য হতে পারবে না। কিন্তু চার মাসের ক্যাম্প প্রশিক্ষণ এবং তিন সপ্তাহের রাইফেল চালনা প্রশিক্ষণ শেষে ওই ছেলেরা এমনকি তাদের প্রশিক্ষককেই ছাড়িয়ে যায়। এই প্রশিক্ষণগুলো সুভাষ চন্দ্রকে নতুনভাবে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস প্রদান করে। তিনি যখন ফোর্ট উইলিয়ামে তাঁর কম্পানিতে যোগদান করলেন, দেখলেন যে তারা (ইংরেজরা) এদেশ নিজেদের বাপ-দাদার মনে করে সব দখল করতে চায়, কিন্তু সেসবে তাদের আদৌ কোনো অধিকার নেই।

কলেজের তৃত্বীয় বছর সেনাবাহিনীতেই চলে যায়। চতুর্থ তথা শেষ বছর সুভাষ মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করেন এবং ১৯১৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে দর্শন শাস্ত্রে সম্মান-স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এই সময় দর্শনে তাঁর আগ্রহ কিছুটা কমে আসে এবং মনঃস্তত্ব পাঠে মনোযোগী হন। অতঃপর এম.এ. কোর্সে মনস্তত্বকে ষিয় হিসেবে নির্বাচন করেন।

এক সন্ধ্যায় তাঁর পিতা তাঁকে ডেকে পাঠালেন। গিয়ে দেখলেন সেখানে তাঁর বড়ো ভাই শরৎ চন্দ্রও উপস্থিত আছেন। জানকীনাথ তাঁকে ইংল্যান্ডে গিয়ে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস অংশগ্রহণমূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বললেন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিনি সুভাষকে চব্বিশ ঘন্টা সময় বেঁধে দিলেন। আকস্মিক ঘটনায় সুভাষ বিস্মত হলেন। কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে বোঝাপরা করে শেষপর্যন্ত পিতার প্রস্তাবে রাজি হলেন। নিয়তীর হাতে আবারো তাঁর পরিকল্পনা বানচাল হয়ে গেলো। তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারলেন না যে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ করে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকুরি করবেন। কিন্তু এর উত্তর ভবিষ্যতের হাতে ন্যাস্ত হলো। ইংল্যান্ডে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট ও জাহাজের টিকেট এক সপ্তাহের মধ্যেই যোগার হয়ে গেলো।

১৫ সেপ্টেম্বর ১৯১৯ সুভাষ চন্দ্র ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালেন।

Spread the love
  • 13
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    13
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন