প্রদীপ ঘটক—এর দুটি অণুগল্প

বন্ধু

 

স্কুল থেকে ফেরার পথে ফাঁকা রাস্তায় ডাকটা শুনলাম “অতনু, অতনু”।

আমার মোটরসাইকেলের আওয়াজ ডাকটাকে আবছা করে দিলেও স্পষ্ট কানে এল। চেনা চেনা ডাক, কিন্তু বহু পুরনো, একটু ধূলো পড়েছে।

পিছন ফিরলাম। মাঠ থেকে উঠে এল একজন। চেনা মুখ, কিন্তু মনে করতে পারছি না। অভুক্ত শরীর, চোয়ারে গাল, গাল ভর্তি কাঁচা পাকা দাড়ি,,মাথার সামনের চুল বেশ পাতলা। হাতে একটা আধ খাওয়া বিড়ি। হাসল, কালো ছাপ পড়েছে দাঁতে। নামটাও মনে করতে পারলাম না।

বসলাম মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানে। দু’গ্লাস চা এল। ভাঙা,,পুরনো টেবিলে। অস্বস্তি হচ্ছিল যখন চায়ের দোকানের লোকটা আমাকে জিজ্ঞাসা করল “ইনি কে মাস্টারমশাই?”

ও অবলীলায় বলে দিল “আমার বন্ধু।” আমি শুধু আরো একবার মুখের দিকে তাকালাম। নামটা এখনও মনে এল না। শুধু মনে এল কোন এককালে কাঁধে কাঁধ দিয়ে বসতাম ওর পাশে।

বর্তমান কথা হল। দেখলাম বহুদূরে আমরা। আমি সমাজের সম্মানীয় স্কুল শিক্ষক, প্রতিষ্ঠিত। ঘরে সুন্দরী বউ, ফুটফুটে ছেলে। আর ও নিজের বর্তমানটা যতটা সম্ভব অন্তরালে রেখে গেল।

তারপর অতীতের কথা এল। মনে এল প্রশান্ত, পিন্টু, গৌতমকে। তারা সবাই আপন আপন ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। আপন আপন সংসার গন্ডীতে বন্দী। কিন্তু ওর কথা মনে এল না।

তারপরেই একটা ঝড় উঠল। প্রচন্ড সে ঝড়। প্রকৃতি ওলট পালট হয়ে গেল। ঝড় থামলে দেখলাম, আমি আর ও পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার হলে। আমি কেমিস্ট্রির প্রশ্ন পেয়ে হতভম্ব হয়ে বসে আছি। আর অংশু খাতাটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলছে “আমার দেখে লেখ। আমার সব কমন। তোকে পাশ করাবোই বন্ধু।”
‘ভিনগ্রহের’ গপ্পো

চুলের মুঠি ধরে সপাটে একটা চড় মেরে অফিসার বললেন “এটা দেখেছিস?”

সূরজ নিজেকে সামলে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে দেখল পকেটের স্টিকারটা ‘অনিল খন্না’।

-আমার ভয়ে অপরাধীরা কাঁপে। যা জিজ্ঞাসা করব সঠিক উত্তর দিবি।

মাথার কাছে ঝুলন্ত বাল্বটা দুলছে। চেয়ারে লেপ্টে বাঁধা সূরজ। খালি গায়ে অজস্র কালসিটে। ঠোঁটের এককোণে রক্ত নেমে আসছে।

-কতদিন চালাচ্ছিস এসব?

হাঁফাচ্ছে সূরজ। জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে। বিস্ফোরিত ভয়ার্ত চোখে বলল “প্রায় তিন বছর।”

-কতগুলো ‘খদ্দের’ জুটিয়েছিলি?

-প্রায় তিনশো

-সব্বাই ইনবক্সে আসতো?

-না, তবে প্রায় জনই আসত।

-ছবিগুলো কার?

-জানি না। তবে অ্যাকাউন্টটার নাম ছিল আয়েশা

-আর নেকেডগুলো?

-নেট থেকে।

-মিট করেছিস কারো সাথে?

-মিট করলে তো ধরা পড়ে যেতাম।

-কেউ মিট করতে চাইলে?

-ইগনোর করতাম।

-কেন করতিস এসব? জানতিস না এটা ক্রাইম?

সূরজ মাথা নামায়। লম্বা চুল ঝুলে পড়ে। চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল জিনসের প্যান্টে।

-কি রে? উত্তর দিচ্ছিস না? চুপ কেন? জানতিস না?

-হ্যাঁ স্যর, জানি।

-তাহলে?

সূরজ অসহায় চোখে অফিসারের দিকে থাকায়।

-কি আনন্দ পেতিস দেখে?

-তার বেশি আর তো কিছু পাওয়ার ছিল না।

-তাহলে? কেন করতিস এসব?

সূরজ আবার মুখ নামায়। অফিসার চুলের মুঠি ধরে তুলে আবার সজোরে চড় “উত্তর দে। জানিস কত বড় শাস্তি হতে পারে তোর?”

সূরজ ভিরমি খায়। তারপর চিৎকার করে বলে “কি করব? আমি স্বাভাবিক নই। সমাজ মেনে নেবে না, অপরাধ ভাববে, টিটকারি দেবে, কিন্তু আমি কি করব? আমি তো প্রকাশ্যে বলতেই পারি না, আমি ছেলেদের পছন্দ করি, কি করতাম, কি করতাম বলে দিন প্লিইইইজ, মারুন মারুন, মেরে ফেলুন, এ জীবন রাখতে চাই না।”

-তোর মত তো অনেক আছে, তাদের খোঁজ।

-পাইনি, যাদের পেয়েছি পছন্দ হয়নি। যাদের পছন্দ তারা ঘৃণা করে।

অফিসার কোমরের বেল্ট ধরে প্যান্টটা একটু তুলে নেন। একটা জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন “তুই টপ না বটম?

মাথা নামিয়ে সূরজ বলে “বটম।”

অফিসার নিজের চেয়ারে ফিরে যান। কিছু লেখালেখি করেন। ফিরে এসে বলেন “আজ তোকে আমার কোয়ার্টারে নিয়ে যাব। আমি একাই থাকি।”

 

 

 

মাষ্টারমশাই

মাস্টারমশাইয়ের গলায় সাদা উত্তরীয়, হাতে সাদা শাল, বোকে,মিষ্টির প্যাকেট। সারা মাঠ জুড়ে বাঁধভাঙা জনতার করতালি।

সকলকে ধন্যবাদ দিয়ে মঞ্চের চেয়ারে বসলেন মাষ্টারমশাই। দু’দিক থেকে দু’টো মুখ এগিয়ে এল মাষ্টারমশাইয়ের কানের কাছে।

নীচু স্বরে বিধায়ক বললেন “ইদানিং আপনার লেখাগুলো একটু অন্যরকম হচ্ছে।”

-অন্যরকম মানে?

অপরদিকে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি বললেন “আগে যেমন গরীব মানুষের সুখ-দুঃখ-বঞ্চনা-ক্ষোভ উঠে আসত আপনার লেখায়, এখন তা আসছে না। বরং স্রোত বিপরীত মুখী।”

স্মিত হেসে মাষ্টারমশাই বলেন “যা চেয়েছিলাম, পেলাম না যে।”

কথাটা ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তার নেতা, পঞ্চায়েত, ব্লক, জেলা “মাষ্টারমশাই, আপনার লেখাগুলো অন্যরকম হচ্ছে।”

মাষ্টারমশাই শুধু হাসেন।

আরো একদিন একদিন করে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ আসে লোকাল অফিসে, ব্লকে, জেলায়। সর্বত্র এক কথা “মাষ্টারমশাই, লেখা অন্যরকম হচ্ছে।”

রাতের অন্ধকারে বর্ধমান ফেরৎ মাষ্টারমশাইয়ের পাশে অযাচিত সাহায্যে এগিয়ে আসে কয়েকটা ছেলে। মাষ্টারমশাইয়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে একটাই কথা “মাষ্টারমশাই, লেখা অন্যরকম হচ্ছে।”

মাষ্টারমশায়ের কলম থামে না।

কিন্তু সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে একদিন পড়ে যান রাস্তায়। রক্ত চোখে কয়েকজন বলে “অনেক হেঁটেছেন, এবার থামুন মাষ্টারমশাই।”

আরো কিছুদিন পরে শহীদ বেদির পাশে কুম্ভীরাশ্রুর সাথে উচ্চারিত হয় “এমন কর্মচঞ্চল মানুষ ‘আত্মহত্যা’ করবেন ভাবতেই পারিনি।”
এটা দেখো
বন্ধু

“আমাকে নেবে না?”

ইনবক্সে আসা মেসেজটার মধ্যে একটা অন্যরকম আকুতি ছিল।

-তুমি ছেলে না মেয়ে?তোমার আসল নাম কি? তোমার পিপি না পেলে নয়।

“নামে কি আসে যায় কবি? আমার ছবি যে দেখাবার মত নয়।”

-কেন, তুমি কি দেখতে কুৎসিত? মানুষ কখনো কুৎসিত হয় বলে আমি বিশ্বাস করি না। তুমি প্রোফাইলে তোমার ছবি দিলে তবেই নেব।

জবাব দিয়ে মোবাইল অফ করি।

পরদিন সকালে মেসেজ বক্সে দেখি তার মেসেজ- “কিন্তু কবি, আমি যে তোমার কবিতার প্রেমে পড়েছি?”

পাঠক/পাঠিকায় বড় লোভ কবির। তাই লিখলাম- “ফলো কর।”

-তাই তো এতদিন করেছি। কিন্তু আমার ভালো লাগা তোমার কাছে পৌঁছাবে কি করে? তোমার অডিয়েন্স যে ফ্রেন্ডদের জন্য শুধু। আমি তাই কিছুই বলতে পারি না কবি? অডিয়েন্সটা পাবলিক করবে?

এমন পাঠক/পাঠিকাকে কি দূরে রাখা যায়?

টাইমলাইন ঘুরে এলাম। বেশ ভাল লেখে সেও। কিন্তু সবই বিষাদের কবিতা।

জিজ্ঞাসা করেছিলাম, শুধু হেসেছিল।

হাসিটা কেমন যেন ম্লান ছিল, তা তার পাঠানো মেসেজের অক্ষরেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম।

প্রতিদিন ‘গুড মর্নিং’ আর ‘ গুড নাইট’পাঠাতে ক্লান্তি গ্রাস করতো না তাকে। আমার প্রতিটা কবিতায় তার কমেন্ট থাকত। গঠনমূলক সমালোচনা করত। আমিও শিখতাম তার কাছে।

রাতের নিস্তব্ধতায় একদিন চেয়ে বসলাম সেলফি।

সে বলল “আমাকে দেখলে তোমার কষ্ট হবে।”

আমি বললাম ” তবু দেখতে চাই।”

সে সেলফি দিল, আমি চমকে উঠলাম।

জিজ্ঞাসা করলাম “কেন এমন?”

সে শুধু হাসল।

প্রতিদিনের ‘গুড মর্নিং’আর ‘গুড নাইট’এর মেসেজ আমার বিরক্তি আনত মাঝে মাঝেই। নামটা ইগনোর করলাম।

অনেকদিন কমেন্ট নেই, মেসেজ বক্স খুলিনি। হঠাৎই একদিন মনে কুচিন্তা এল।

‘নিউ মেসেজ রিকুয়েস্ট’ খুলতেই করতেই একগাদা ‘গুড মর্নিং’আর ‘গুড নাইট’এর মাঝে দুটো মেসেজ-

“যেদিন সবুজ আলো জ্বলবে না সেদিন জানবে আমি নেই”
আর

“আসি বন্ধু”।

চোখে ভেসে উঠল সেলফিটা, ন্যাড়া মাথা, যন্ত্রণাক্লিষ্ট একটা মুখ।

Spread the love
  • 106
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    106
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন