অণুগল্প, লিটল ম্যাগ এবং কয়েকটি পরামর্শ || বিলাল হোসেন

 

এমন হচ্ছে—ইদানিংঅনেক লিটল ম্যাগ ‘অণুগল্প’ সংখ্যা বের করছেন অণুগল্পের প্রতি ভালবেসে ,দায়িত্ববোধ থেকে। তাদের এই ভালবাসা এবং দায়িত্ববোধ নিঃসন্দেহে অণুগল্পের জন্যে  প্রশংসিত আর  ইতিবাচক একটি গতিবান স্রোতের জন্ম দিচ্ছে, যে স্রোত অণুগল্পকে নিয়ে যাবে সেই বন্দরে যেখানে বাঁধা থাকে ইতিহাসের  নোঙর । এপার ওপারে তাই যেসব অণুগল্পসংখ্যা বেরিয়েছে বা বেরুবে বেরুবে করছে পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে খুব বেশি না হলেও অণুগল্পের নিরিখে অবশ্যই বেশি—এই যুক্তিতেঃ অণুগল্প বয়সে নবীন।এই সেদিনও এর অস্তিত্ব ছিল না। অথচ নিজগুণে অণুগল্প আজ এমন বলীয়ান এমন প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে যে আধো আধো  বোল বলা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী উজ্জ্বল চরিত্রের  অণুগল্পকে সবাই ভালবেসেছে । তাকে নিজের করে ভাবছেন। ফলে অণুগল্পের প্রয়োজনে না হলেও অণুগল্পের সঙ্গে থেকে ,সান্নিধ্যে থেকে  নিজের আধুনিকমনস্কতার পরিচয় তুলে ধরতেও জরুরী হয়ে পড়েছে। এর ফলে শেষপর্যন্ত লাভবান হচ্ছে অণুগল্পই।কারণ এতে করে অণুগল্পের পক্ষে এ্কেকটি  উল্লম্ফন রচিত হচ্ছে আর ছোটবড় এই উল্লম্ফনের  মাধ্যমে   বৃহত্তর পাঠকের দুনিয়ায় অণুগল্প প্রবেশ করছে, করবে।

দিকে দিকে আগুন জ্বালানোর মতই সব জায়গা থেকে অণুগল্প সংখ্যা বের করা দরকার। অণুগল্পের ভবিষ্যৎ -তাই হবে।  অণুগল্পবিহীন পত্রপত্রিকা বাংলায় খুঁজে পাওয়া দুস্কর হয়ে উঠবে। নিজেদের প্রচারের জন্যে , পত্রিকার কাটতির জন্যে, অণুগল্পের  গ্রাভিটিবলয়ের টানে পত্রপত্রিকার মেরুদণ্ড দিন দিন শক্ত হয়ে উঠবে, অণুগল্পের অপার্থিব হিরন্ময় আলোর বিচ্ছুরণে ঝিলমিল করে উঠবে পত্র পত্রিকার প্রথম,মধ্যম আর শেষ অংশ, পাঠকদের ক্রমাগত চাহিদার শেষ যোগানদাতা অণুগল্প দিন দিন সাহিত্যের মূল শেকড় হয়ে প্রোথিত হতে থাকবে  গভীর থেকে গভীরে।

সে-এক দিন আসবে বটে সাহিত্যের জীবনে!

এবং এই করে করে অণুগল্প সাহিত্যের একটি শাখা হিসেবে যে শক্তভিত্তির ওপর  দাঁড়িয়ে আছে ,সে ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে চোখ জুড়ানো ইমারত। এই যে ইমারত হওয়া, সে-ইমারতের কোন  ধ্বংস নেই, ক্ষয় নেই।ঝড় বাদলে কিছু হবে না।না ব্জ্রপাত না ভুমিকম্প কোন কিছুতেই এই ইমারত টলবে না। দুলবে না,বিধ্বস্ত হবে না। তবু এক  ভিতরগত ভয় কখনও কখনও এমনভাবে ঝাপটে ধরে; চিৎকার করে উঠতে হয় ।এর সুনির্দিস্ট কারণ আছে।

ইতিহাস সব সময় একইরকম হয় না। ইতিহাস সব সময় ঘুরেফিরে আসে—এমন তো নাও হতে পারে। যেমন ছোটগল্প প্রতিষ্ঠালগ্ন, যেসব কারণ সাহিত্যে সমাজে, দেশে মানুষের মনে সংঘটিত হয়েছিলগ,অণুগল্প পত্তনকালে সেই একই কারণ ফিরে আসেনি। ছোটগল্পের সেই প্রারম্ভিক কালে উনবিংশ শতাব্দীর  জনজীবনের হতাশা যুদ্ধ ,অবরোধ,হিংসা, দারিদ্রতার ঘেরাটোপে বন্দী ছিল ইউরোপ । অস্থিরমানুষের চিত্ত শান্ত করার,স্থির করার মাধ্যম হিসেবে মোটা মোটা উপন্যাসের প্রতি বিরাগ জন্মেছিল। সময় সংকটে,অর্থ সংকটে মানুষের জীবন উদ্ভ্রান্ত হয়ে উঠেছিল। ফলে গ্রন্থপাঠ,সংবাদপত্রপাঠ হ্রাস পাওয়াতে সম্পাদকগণ উপন্যাসের প্লট হিসেবে এমন কিছু ছাপাচ্ছিলেন যেন পাঠক ধরে রাখা যায় । ধরে রাখা যায় পত্রিকার কাটতি ।

ব্যবসায়িক ভাবে বুদ্ধিদীপ্ত সে কার্যক্রমে সম্পাদকগণ সফল হয়েছিলেন। তাঁরা ছোটগল্পের লেখক সৃষ্টি করছিলেন। তাঁরা ছোটগল্প সম্পর্কিত নানান টিপস,নির্দেশনা দিয়ে দিয়ে তাঁদের মনের মত ছোটগল্প লিখিয়ে নিয়েছিলেন; শুধু তাই নয়  ছোটগল্পের ভবিষ্যৎও নিশ্চিত করে দিয়েছিলেন।

ছোটগল্পের  মত অণুগল্পের উত্থানপর্বে এইধরণের কোন ব্যাপার নেই। অন্তত পত্রপত্রিকার সম্পাদকদের  কোন অবদান এক্ষেত্রে নেই। উনবিংশশতকের সেই অস্থিরতা নেই, মানুষের জীবনের শান্তিবিনষ্টকারী  কোন যুদ্ধ  এখন আর নেই। সম্পাদকদের ভয়নেই পত্রিকার কাটতি হ্রাস পাওয়ার।

বরং অণুগল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহের কারণ অন্য এক জায়গায় ।

লিটলম্যাগ আঙ্গিক ফর্ম  শিল্পরূপ নিয়ে চিরকালই আগ্রহী,পেছনের প্রচলিত সমস্ত আঙ্গিক-ফর্ম-শিল্পরূপকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোটাওএকটি অন্যরকম চরিত্র। ফলে একই সাথে উৎপাটন এবং অঙ্কুরোদগম,বিনাশ ও পত্তনে যুগপৎ ক্রিয়াশীল। কিন্তু  দীর্ঘদিন যাবত লিটল ম্যাগগুলি সাহিত্যের কোন বাঁক পরিবর্তনের আন্দোলনে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারছিল না, সাহিত্যের কোন অংশ নিয়ে , তত্ত্ব বা ফর্ম নিয়ে কোন আন্দোলন দানা বাঁধেনি বা লিটলম্যাগ দানা বাঁধাতে সক্ষম না-হওয়াতে  শুকিয়ে যাওয়া ধারার মত বইছিল ।

ফলত লিটল  ম্যাগ ধুঁকছিল ইস্যুর অভাবে, বিষয়াভাবে। এক  শূন্যতাক্রান্ত  দীর্ঘসময় অতিক্রান্ত হওয়ার এই সময়ে  অণুগল্প এল । পার্থক্য হল— অন্যবারে লিটল ম্যাগকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট গোষ্ঠীবদ্ধ লেখকেরা প্রচলিত সাহিত্যক অনুশাসনের  সামনে বিদ্রোহী হয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেন ।  চলমান সব রকমের শৈল্পিক   বিধিকে অস্বীকার করে নতুন শিল্পকলা দেখাতে  চাইতেন। সবরকম আঙ্গিক ভেঙে নতুন পথে যাত্রার উদ্দীপনামুলক সাহিত্যরূপ দেখানোর চেষ্টা করতেন।

ফেসবুকের কল্যাণে অণুগল্প ধীরে ধীরে পাখা মেলতে মেলতে মধ্যগগনের এমন এক জায়গায় পৌছে গিয়েছে  যে, তাকে সবাই দেখছে , দেখতে পারছে। অণুগল্প আর পেছনের লুকিয়ে থাকার কোন  বিষয় নেই । বরং কেউ দেখতে না চাইলেও অণুগল্পের দীপ্ত আলো সবার চোখে গিয়ে পড়ছে।

লিটল ম্যাগের এই যে বহুকালের ক্ষুধার্ত উদরটিপুর্তি করার জন্যে  খাদ্য হিসেবে অণুগল্প সুস্বাদু।লিটল ম্যাগ সম্পাদকগণ,অণুগল্পের বিকাশ প্রচার ও প্রসারে যতটুকু এখন পর্যন্ত হয়েছে তার থেকে আরও অনেকখানি  এগিয়ে দেওয়ার জন্যে এইসব লিটল ম্যাগ ভূমিকা রাখার জন্যে হাত বাড়িয়েছে— সেটা অণুগল্পের জন্যে বিশেষ পাওনা।

তবে এমনও হচ্ছে,লক্ষ্য করছি— পত্রিকার অনেক সম্পাদক আবার কিছুটা তাড়াহুড়োও করে ফেলছেন। ফলে অণুগল্প লিখে বা প্রবন্ধ রচনার মধ্যে দিয়ে এবং প্রকাশনা দিয়ে অণুগল্প সম্পর্কিত যে প্রস্তাবনা  দিয়ে আসা হচ্ছিল   দীর্ঘদিন যাবত; সে সম্পর্কে এসব পত্রিকার সম্পাদকরা নিতান্তই অজ্ঞতার মধ্যে আছে।

সুতরাং  আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে বেশকিছু।

অণুগল্প যেহেতু একটি নবতর বিষয়এবং এর অভিনব ফর্ম্যাটের সঙ্গে অর্থাৎ এর লেখনশৈলী,করণকৌশল  বিষয়ে যদি পরিষ্কার ধারণা না রেখেই সম্পাদকরা অণুগল্প সংখ্যা বের করেন  তবে অণুগল্পের প্রতি হয়ত সঠিক বিচারটি সম্পন্ন না হয়ে অবিচারই করা হবে।  সম্প্রতি অণুগল্প সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত কয়েকটি পত্রিকায়  অণুগল্প সম্পর্কিত প্রবন্ধ দেখলেই বুঝতে কষ্ট হয় না যে,লেখকদের রয়েছে  অণুগল্প সম্পর্কে  ব্যাপক ভুল ধারণা ।  যেমন—

অণুগল্প লিখিয়ে নন কিন্তু অণুগল্প সম্পর্কিত জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখতে পটু কিছু  প্রাবন্ধিকের আবির্ভাব ঘটেছে— অণুগল্প আর  ফ্ল্যাশ ফিকশনকে এক করে ফেলেছেন তারা। তারা মনে করছেন ফ্ল্যাশ ফিকশনই বুঝি—বাংলার অণুগল্প। এ সম্পর্কে এর আগে অনেক কথা বলা হয়েছে । বিশ্বসাহিত্যে  ফ্ল্যাশফিকশন একটি নাম মাত্র । এমন কোন তত্ত্ব ,ফর্ম্যাট বা আঙ্গিক নেই যাতে ফ্লাশফিকশন একটি নবতর,ভিন্নতর সাহিত্য বলে মান্য হয়ে ওঠে। বরংএর শব্দ সংখ্যাসহ অন্যান্য বিষয়সম্পর্কে যাকিছু জানা যায় তা অত্যন্ত যৎকিঞ্চিৎ; একই সাথে বিভ্রান্তিমূলক। সর্বজন সমর্থিত কোন একটি দিক নেই— যাকে ভিত্তি করে বলা যেতে পারে— একে ফ্ল্যাশ ফিকশন বলে। এই শব্দটি মুখে মুখে রচিত হওয়া একটা বায়বীয় বেলুনমাত্র । যে বেলুন ওড়ার কথা ছিল—উড়েছে ।এইটুকুই। ফ্ল্যাশ ফিকশনের নামের সাথে আরো কিছু নাম উচ্চারিত হয়। সেগুলো হল—ন্যানো ফিকশন, মাইক্রো ফিকশন, পোষ্টকার্ড ফিকশন, সুপার শর্ট ফিকশন, শর্ট শর্ট স্টোরি, সাডেন ফিকশন  ঝুরো গল্প  ইত্যাদি । অণুগল্পের সাথে কেউ কেউ এই   নামগুলিও  মিলিয়ে ফেলেছেন। তাঁরা কেউ বুঝতেই পারেননি যে ফ্ল্যাশ ফিকশন আর অণুগল্প একই বস্তু নয় ।সব অণুগল্পই  ফ্ল্যাশ ফিকশন  হলেও  সব ফ্ল্যাশ ফিকশন অণুগল্প নয়।

তাছাড়া এইসব অণুগল্প সংখ্যায় অণুগল্প সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলি যারা লিখছেন—দেখলেই বুঝতে পারা যায় বেশিরভাগই গুগুল বা অনলাইন থেকে  জাস্ট কপি করা।

এইসব পত্রিকার সম্পাদকদের অণুগল্প সম্পর্কিত ধারণা না থাকাতে এবং প্রবন্ধরচয়িতারা কেউ অণুগল্প লেখক না  হওয়াতে আজেবাজে ধারণাপ্রসূত বিষয়কে অণুগল্পের ধারণা হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছেন। তাদের একটি অন্যতম ধারণার মধ্যে একটি ধারণা হল এই— অণুগল্প নিয়ে যে হইচই হচ্ছে , সাহিত্যের শাখা হিসেবে যে প্রচার প্রোপাগান্ডা চলছে এবং একদল  মানুষ অণুগল্প সম্পর্কিত যে উচ্চধারণা পোষণ করেন—এইসব  তো নতুন কিছু না। আমাদের  বনফুল হলেন অণুগল্পের স্থপতি /জনক/প্রতিষ্ঠাতা।

বনফুল যে অণুগল্প লেখেননি , অণুগল্পের নাম শোনেননি, অণুগল্পের ফর্ম্যাট,কাঠামো,অবকাঠামো সম্পর্কে ধারণা রাখেননি এই নিয়ে আমার পৃথক আলোচনা আছে।  কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি—

বনফুল নিয়ে অজ্ঞতার কালোস্রোত
=======================

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প শাখায় যাঁরা নতুন ফর্ম্যাটে পাঠকরুচিকে অন্য স্বাদের সাহিত্যরসের সন্ধান দিয়েছেন তাদের মধ্যে বনফুল অন্যতম না হলেও একজন । বনফুল তার দীর্ঘজীবনে প্রচুর ছোটগল্প লিখেছেন ।

একথা সত্য যে , বনফুল পাঠকপ্রিয় ছিলেন । তার গল্পের সহজ ভাষা , কাহিনির সারল্য ,বিশেষকরে একটি বিশেষ গঠনশৈলীর কারণে পাঠকের কাছে নতুন কিছু বলেই মনে হল । ফলে বনফুল আলোচিত হলেন ।

বনফুল মোট ৫৮৬টি ছোটগল্প লিখেছেন । এই গল্পগুলি আকারে ছোট/বড় বিভিন্ন আয়তনের । অনেকেই ধারণা করে এইকথা বলে থাকেন যে , বনফুলের গল্পের আয়তন ছোট । ছোট , তবে সব গল্পের জন্যে একথা যেমন খাটে না , তেমনি খাটে না তার বড়গল্প নেইএই মন্তব্যে ।
পেশায় একজন ফিজিশিয়ান হওয়াতে তার কাছে রোগীদের ভিড় ছিল । বনফুল রোগীদের কেস হিস্ট্রি লিখতেন । ভাবতেন
পরে এটাকে বড় করে গল্পে রুপান্তর করবেন । কিন্তু সেটা ভাবনা পর্যন্তই ছিল হয়ে উঠত না । পাঠকরা পেতেন অপেক্ষাকৃত স্বল্পায়তনের ছোটগল্প

একালে , যখন অণুগল্পের কাঠামো তৈরি হচ্ছে , লেখনশৈলীর নিজস্ব ভুবন নির্মাণ হচ্ছে অণুগল্পের , বিভিন্ন উপাদানের সংশ্লিষ্টতায় অই ভুবনের আদ্যোপান্ত নিয়ে আলাপ হচ্ছে । সেই আলাপের ভেতর থেকেই প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ অণুগল্প নতুন কিছু নয় । বনফুল অণুগল্প লিখেছেন অনেক আগেই ।

অনেকেই , বেশিরভাগ এ-প্রশ্নটি একারণে করেন যেন অণুগল্পের ভিতটি নড়ে ওঠে , স্তম্ভটি ধসে পড়ে , অনেকেই করেন জানার জন্যে; যদি প্রশ্ন করার ফলে নতুন কিছু তথ্য বের হয়ে আসেসেই ইচ্ছায় । অনেকেই আবার অণুগল্প বিষয়ে অজ্ঞতার কারণেও এমনকি বনফুলকে না-জানার কারণেও এই প্রশ্নটি করে থাকেন । অর্থাৎ অজ্ঞতাই হল এই প্রশ্নের জনক ।
.
বিদ্বেষ বা অজ্ঞতাপ্রসূত এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে যে আলোচনাটি করা দরকার , প্রকৃতঅর্থেই সে সুযোগটি নেই আপাতত ।

শুধু এ-কথাটি এখানে বলা যেতে পারে বনফুল ৫৮৬টি গল্প লিখেছেন ,এর মধ্যে সচেতনভাবে একটি অণুগল্পও লেখেননি । ছোট ছোট ছোটগল্প যেমন অণুগল্প নয় , একইভাবে স্বল্পায়তনের অনেক অণুগল্পও ছোটগল্পের মহিমা নিয়ে আলো ছড়ায় যদিও সেগুলো অণুগল্প নামে সম্বোধিত হয় অহরহ ।
ফলে দুই শ্রেনীর মধ্যেই আছে অজ্ঞতা নামের কালোস্রোত ।

যদি এমন হয় একবিংশ শতকের সাহিত্যের এই অভূতপুর্ব শাখাটির সাথে বনফুল লিখিত গল্পের সাদৃশ্যআছে, অণুগল্পের ফর্ম্যাটের সমস্ত চাহিদা বনফুল লিখিত গল্পটির মধ্যে বিদ্যমান সেক্ষেত্রে একথা-ই বলা যাবে যে তিনি অণুগল্পের সাদৃশ্যমুলক ছোটগল্প লিখেছেন । কেননা বনফুল কখনোই অণুগল্প লেখেননি ।

কিছু পত্রপত্রিকা আমার কাছে আছে।
সেইসব পত্রিকা হাতে নিয়ে পৃষ্ঠা উলটাতে উলটাতে নিজেকে যারপর নাই  ফালতু বলে মনে হয় । সেইসব পত্রিকার প্রথম থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত অণুগল্পকে বলাৎকার করা হয় । এই মুহুর্তে আমার হাতে যে পত্রিকাগুলি আছে,ঘেঁটে দেখা গেল [পত্রিকাটি ২০১৮ সালে প্রকাশিত]বাংলা সাহিত্যে হেন লেখক নাই যিনি অণুগল্পকার নন— বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধয়ায় একজন অণুগল্পকার,রবীন্দ্রনাথ একজন অণুগল্পকার।শরৎচন্দ্র একজন অণুগল্পকার,অণুগল্পকারের তালিকায় আছেন—রামানন্দ চট্টপাধয়ায়,সৈয়দ মুজতবা আলী,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ,মরেশ,সোমেন—এইভাবে বাংলাসাহিত্যের প্রচুর লেখক অণুগল্পকার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন।যদি এমন হত—আমার ধারণা—পত্রিকাটিতে  স্থান সংকুলানের সমস্যা না থাকত তবে বাংসা সাহিত্যের এমন কোন লেখকই বাদ যেতেন না।সবাইকে অণুগল্পকার বানিয়েই ছাড়তেন সম্পাদকদ্বয়।এই যে সবাইকে অণুগল্পকার বানিয়ে দিলেন সেটা কীভাবে এক্টু ব্যাখ্যা করা দরকার।বঙ্কিমের ‘মৃণালিনী’ থেকে নির্বাচিত একটি অংশ নিয়ে,রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের একটি নির্বাচিত অংশ নিয়ে,শরৎচন্দ্রের ‘অভাগীর স্বর্গ’ থেকে নির্বাচিত অংশ নিয়ে,এমনি করে অন্যান্যদের নির্বাচিত অংশ নিয়ে অণুগল্পের পর অণুগল্প বিধৃত হয়েছে।এইসব নির্বাচিত অংশকে আবার সম্পাদকরা নিজেই নামকরণ করেছেন।
এই হল অণুগল্প!এই অণুগল্পই নাকি সাহিত্যের নতুন শাখা!স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত শাখা। বাংলা সাহিত্য কি এমন অণুগল্প চেয়েছিল?এইসব স্বনামধন্য সাহিত্যিকদের পাশাপাশি আছে বর্তমান লেখকদের রচিত অণুগল্প।

কথা যখন উঠলই বলে ফেলি।এই যে সম্পাদকরা বড় বড় উপন্যাসের অংশ বিশেষ নির্বাচিত করে অণুগল্পের নামে চালিয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত আছে অণুগল্প সম্পর্কিত তাদের অজ্ঞানতা । অণুগল্পের জোয়ারে ভাসতে থাকা বা অণুগল্পের প্রতি তাদের আসক্তিকে খাটো না করে শ্রদ্ধার সাথে বলতে পারি— অণুগল্প যেসব কারণে সর্বস্তরের মধ্যে গণ্য হল,সমাদৃত হল এবং অণুগল্প আলাদা শাখা হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করল—সেসব তথ্যের সাথে এই সম্পাদকের দূরতম সম্পর্ক নেই । ‘ আকারে ছোট’ লেখাকেই তারা অণুগল্প হিসেবে ঠাউরে বসে আছেন। এর প্রমাণ এই বইয়ের পাতায় পাতায় । কোন ফর্ম্যাট,লেখকশৈলী ,করণকৌশল কিংবা অবকাঠামো তৈরিতে এই পত্রিকা/বইটি আলোচনা করে না। বা বিশ্বাস করে না, বা মাথাতেই নেই । ফলে অণুগল্পের অগ্রযাত্রায় এইটি কোন কাজে আসবে জানি না । তবে অণুগল্পের পথ পরিক্রমায় বইটি যে আরও ধোঁয়াশা সৃষ্টি করবে সে বিষয়ে আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। ধোঁয়াশার বিষয়টি নিয়ে পরে আলাপ করছি । তার আগে আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় । সেটি হল—এই যে বিভিন্ন লেখকের নির্বাচিত অংশ কেটেকুটে অণুগল্প বানানোর অপচেষ্টা, সেটি নতুন নয় । এই কর্মটি একদা অণুগল্প গ্রুপেও হয়েছিল । ‘অণুগল্প কুড়াই’ লিখে সার্চ দিলেই বেরিয়ে আসবে সেইসব লেখা । বঙ্কিম ,হুমায়ুন আজাদ ,আখতারুজ্জামান ইলিয়াস , হাসান আজিজুল হক ,কমলকুমার মজুমদার , নাসরীন জাহান –এইরকম অনেকের লেখা থেকে কেটে কেটে অণুগল্প বানানোর একটি আদিকর্ম আমরা করেছিলাম যখন অণুগল্প ছিল বীজতলায় উপ্ত । আজ আর সেসবের দরকার নেই । কারণ বীজ থেকে গাছ অংকুরোদ্গম হয়েছে । ডালপালা ছড়িয়েছে ,এবং পরিপুর্ণ গাছটি বৃক্ষে রূপান্তরিত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে ।
এই কারণেই বলছিলাম সম্পাদকদ্বয় কোথায় পড়ে আছেন !তবে এগিয়ে আসতে বাধা কোথায়? একসাথে কাজ করলে অণুগল্প আরও একধাপ এগুবে এতে কোন সন্দেহ নেই । সে প্রস্তাবে আসতে গেলে সব রকমের স্ববিরোধী বক্তব্য ,দেশকালভাষা বিভক্তি দুর করতে হবে । অণুগল্প বিষয়ক ধারণার মধ্যে নানা মততত্ত্ব আসতে পারে এতে অণুগল্প সমৃদ্ধ হবে কিন্তু ধোঁয়াশা সৃষ্টিকারী কাজকর্ম বা পেছনে হাঁটার সব রকম চেষ্টা না করাই ভাল।

কেউ কেউ  আবার মনে করছেন— বিষয়টি আলাদা করে নিয়েই বলছি;এটা প্রায় সবাই করে থাকেন— অণুগল্প আর আখ্যানের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন । তারা জানেন না—অণুগল্প আর আখ্যান একই বস্তু নয়।সব আখ্যান অণুগল্প নয় কিন্তু সব অণুগল্পের মধ্যে একটা আখ্যান পাওয়া যায় । যে সব আখ্যান অণুগল্প হিসেবে সম্বোধিত  হচ্ছে— সেসব ফ্ল্যাশফিকশনের সাথে তুলনীয় হতে পারে বড়জোর কিন্তু অণুগল্প নয় একেবারেই।

কেউ কেউ আছেন অণুগল্পকে অণুগল্প হিসেবে না দেখে কবিতার মধ্যে গণ্য করেন। এঁদের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে যদিও। এর মধ্যে এক সম্পাদকের একটা ফোন পেলাম। তারা অণুগল্প সংখ্যা  করতে চান। বললেন—অণুগল্পের সাথে কবিতার সাদৃশ্য আছে । অণুগল্পের সাথে কবিতার এই নিবিড় সম্পর্ককে ধরে একটি প্রবন্ধ লেখাতে চাই। কোন কবিকে ধরলে  ভাল হয়?

স্তম্ভিত হয়ে যাওয়ার মত  প্রশ্ন।

কবিতা আর অণুগল্প সম্পর্কে কী পরিমান অজ্ঞ হলে এই ধরণের প্রশ্ন আসতে পারে । কবিতার সাথে অণুগল্পকে মেলাচ্ছেন—এটা যত না অজ্ঞতার;হতেই পারে তার এমন;অনেকেরই হয়;বিশেষ করে অ-গল্প না-গল্প জাতীয় অণুগল্পের বেলায় অজ্ঞানতাবশতঃ এমন হতেই পারে। কিন্তু আমার ফোকাসবিন্দুটি অন্য জায়গায় । একজন সম্পাদক অণুগল্প আর কবিতার আলোচনা করতে একজন কবিকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন যিনি  কখনই অণুগল্প লেখেননি। এই কবি অণুগল্প নিয়ে কি ভাষ্য দেবেন ,দিতে পারেন—সেটাই ভাবছি। আর এই পত্রিকাই বা অণুগল্প সংখ্যা হিসেবে অণুগল্পকে কীভাবেই বা সমৃদ্ধ  করবেন!

আরো অনেক কথা আছে । একজন সম্পাদক অণুগল্পকে পিছিয়ে দিতে পারেন আবার  একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব। তবে শেষাংশে এই কথা দ্বিরুক্তি করছি— আপনার নিজের যতক্ষণ পর্যন্ত না,অণুগল্প সম্পর্কিত ধারণা পরিষ্কার হবে,ততক্ষণ বিরত থাকুন। একমাত্র অণুগল্পকারদের নিকট থেকেই অণুগল্প সম্পর্কিত প্রবন্ধ আহ্বান করুন। এইটা জানুন— কবিতা আর অণুগল্প একই বস্থু নয়। আখ্যান আর অণুগল্প একই জিনিস নয়। অণুগল্প এবং ফ্ল্যাশ ফিকশন একই বস্তু নয়। অণুগল্প  বাঙালিদের দ্বারা বাংলায় উদ্ভাবিত-জারিত-প্রতিপালিত সাহিত্যের সেই মাধ্যম যা  অন্যকোন দেশ থেকে আনা আইডিয়া নয়।

সুতরাং, সম্পাদকগণ, আগে অণুগল্প সম্পর্কে চর্চা পড়াশনা এবং জেনেশুনে তারপর এই ধরণের সংখ্যা বের করার জন্যে পরামর্শ থাকল।

 

 

 

Spread the love
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    20
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন