মিটু আন্দোলনে আপাত প্রাপ্তি

।।রুমা মোদক।।

নারীকেন্দ্রিক সমাজ যখন থেকে পুরুষতন্ত্রের অধীন হয়েছে, তখন থেকেই নারীর জীবন প্রকৃতিপ্রদত্ত গৌরব বিচ্যূত হয়ে তার শৃঙ্খলিত জীবনচক্রের শুরু।
প্রকৃতির প্রানীজগতের মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রানীদের মধ্যে নারী-পুরুষ দুই প্রজাতির পারস্পরিক সম্পর্ক জৈবিক,সেখানে মূল্যবোধ, সামাজিক জীবন অনুপস্থিত। সেখানেও অধিকাংশ প্রজাতির মধ্যে নারী প্রানীটির মধ্যে প্রকৃতিগতভাবেই সন্তান লালনপালনের দায় বর্তায়। একমাত্র মানব প্রজাতির মধ্যেঈ এই সন্তান ধারণ থেকে লালনপালন অবধি মাতার সাথে পিতার ধারণা সংযুক্ত হয়েছে। এই সংযুক্তি প্রকৃতিপ্রদত্ত নয়,বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সংশ্লিষ্ট।
মূলত নারীর এই সন্তান ধারণ এবং লালনপালনের জন্য একটা দীর্ঘসময় নারীকে থাকতে হয় উৎপাদনহীন, আর এই উৎপাদনহীন সময়ের সুযোগে পুরুষ যে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের আধিপত্য গ্রহন করে,সময়ের বিবর্তনে সেই আধিপত্য নির্যাতনে রূপ নিয়েছে।

দেশে-কালে-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এই নির্যাতন শুধু হার এবং রূপ পরিবর্তন করে। কিন্তু নির্যাতনের রীতি বদলায় না এবং তা পুরোটাই যৌন নিগ্রহ। এই কারণেই কৃষ্ণাঙ্গ সমাজকর্মী টারানা বার্কের উপলব্ধি “মিটু” দেশকালের সীমানা অতিক্রম করে হয়ে ওঠেছে বিশ্বের সব নারীর অন্তরের আর্তি। নিজ ঘর থেকে কর্মস্থল নারীর জন্য মানুষের তৈরি সোকল্ড সভ্যতায় নিরাপদ স্থান বলতে গেলে দুর্লভ। এমন একজন নারীও হয়তো এ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া মুশকিল যে কোথাও না কোথাও অপ্রিয় স্পর্শ কিংবা বল প্রয়োগে দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়নি। উন্নত দেশে তার হার কম হলেও আমাদের মতো অনুন্নত ও অনুদার সাংস্কৃতিক পরিবেশে তার হার অনেক বেশি।

কিন্তু তারপরও মিটু বলে নির্যাতনের ইতিবৃত্ত নিয়ে মুখ খোলার সাহসটুকু আমাদের ধার করতে হয়েছে পাশ্চাত্য থেকে। এই ধার করার ইতিহাস ধারণ করে আমাদের নারীদের প্রকৃত অবস্থা। এই পর্যন্ত “মিটু” নিয়ে যারা মুখ খুলেছেন তারা কোন না কোনভাবে আবার পুরুষ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন, সন্দেহের স্বীকার হয়েছেন এবং পুরুষতন্ত্রের ধারক এই সমাজ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে “প্রমাণ” চেয়েছেন।

আমাদের সমাজে একজন নারীর যৌন নিগ্রহের প্রথম দুঃসহ অভিজ্ঞতাটি শুরু হয়,নিজের ঘরে মামা-চাচা ইত্যাদি সামাজিকভাবে গুরুস্থানীয়দের হাতে। অতপর অফিসের বস, সহকর্মী, গণপরিবহনে সহযাত্রী, সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক সহযোদ্ধা কোথায় হয়রানির শিকার হয়না সে! কিন্তু আমাদের সামাজিক মূল্যবোধে এ নিয়ে মুখ খোলা নিষেধ। মুখ খুললে পাল্টা অভিযোগের আঙুল ওঠে মেয়েটির দিকেই। এবং অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌছায় যে মুখ খোলার কারণে তাঁর স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

উন্নত বিশ্বের সাথে আমাদের মৌলিক তফাৎটা এখানেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মনিকা লিউনাস্কি প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে ‘সে আগে বললো না কেন’ ‘সে একা গেলো কেন’ ‘ আর কেউ বললো না কেন’ ‘ সে এটেনশন সিকার’ ‘ সে প্ররোচিত হয়ে বলছে’ ইত্যাদি নানাবিধ অভিযোগ আজীবন তাঁর পিছু তাড়া করবে,আঙুল তুলে বলবে- এতো সেই মেয়ে! এতো বাইরের ভোগান্তি, যে ঘরে সে বাস করে, সে ঘরেও তো এই অনুদার সামন্তমানসিকতার পুরুষ কিংবা নারীর বাস। এই মুখ খুলার মাশুল তাঁকে ঘরের ভেতর কতোটা দিতে হয় তা হয়তো অব্যক্তঈ থেকে যাবে।

গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা প্রযোজক হারভে উইনস্ট্যান এর বিরুদ্ধে যৌন পীড়নের একাধিক অভিযোগ ওঠলে একজন অভিযোগকারী অভিনেত্রী আলিসা মিলানোর হাত ধরে এই আন্দোলন সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আর সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে এই প্রতিবাদী প্রচার বিশ্বব্যাপী দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই অভিযোগে বিশ্বব্যাপী নারীদের অভিযোগের তীরে বিদ্ধ হয়ে একে একে নগ্ন হয়ে পড়েছে প্রভাবশালী কিংবা আপাত শ্রদ্ধাযোগ্য মানুষদের ফাঁপা ভাবমূর্তির জগত।জানা গেছে,নারী যেখানেই দাঁড়িয়েছে যোগ্যতা, প্রতিভা কিংবা দক্ষতা ইত্যাদি যা কিছু অর্জন নিয়ে সেখানেই তাঁকে মুখোমুখি হতে হয়েছে নারী হিসাবে অপ্রিয় অভিজ্ঞতার। আর সবক্ষেত্রেই নারীকে চুপ করে মেনে নিতে হয়েছে প্রথমত সামাজিক আঙুল পাল্টা তাঁর দিকে ওঠার ভয়ে কিংবা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতিহিংসার কারণে কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌছাতে না পারার ভয়ে।

রুমা মোদক, লেখক ও নাট্যজন

না নিশ্চই এই দেশে এখনো মিটু সার্বজনীন হয়ে ওঠেনি। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি কর্মক্ষেত্রে, ভার্চুয়াল জগতে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীদের অধিকাংশই এখনো মুখ খুলেননি। আদৌ হয়তো খুলবেন না, কারণ আমরা এখনো এ অবস্থায় পৌছিনি। যে অবস্থায় পৌঁছালে মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন ঘটে, নিপীড়নের শিকার মেয়েটির দিকে পাল্টা আঙুল তুলে না। যদি সেই সমাজের নিশ্চয়তা দেয়া যায়, যে সমাজ ভাবতে পারে নিপীড়নের লজ্জা মোটেই নারীর নয় তবে নিশ্চই নারী সাহসী হয়ে মিটু বলার আগে নিপীড়নকারীর গালে কষে একটা অপমানের থাপ্পড় দিতে পারবে। যদি নিশ্চয়তা দেয়া যায়, মুখ খুলার জন্য মেয়েটিকে কর্মক্ষেত্রে বা সামাজিক জীবনে কোন মাশুল দিতে হবে না বরং নিপীড়নকারীই শাস্তি পাবে তবে হয়তো এই নিপীড়নটাই হ্রাস পাবে বহুলাংশে।

আর এর আগে পর্যন্ত এই আন্দোলনে আমাদের আপাত লাভ নিপীড়নকারী পুরুষগোষ্ঠীর টনক নড়া। এতোদিন নির্বিচারে নারীদের হয়রানি করে যাওয়া পুরুষকূল এই আন্দোলনের সুনামিতে ভীত বিপর্যস্ত, আতঙ্কগ্রস্ত। আতঙ্কগ্রস্ত তাদের মুখের উপর ঝুলিয়ে রাখা সামাজিক ভালোমানুষীর ভাবমূর্তি খসে পরার ভয়ে। তাই অভিবাদন সেই নারীদের, যারা মুখ খুলেছেন। অব্যাহত থাকুক সাহসী নারীদের উচ্চারণ, তার ফলে অন্তত আর কেউ নতুন করে নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

Spread the love
  • 18
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    18
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন