তারেকের খাম্বা বৃত্তান্ত

২০০৩ সালের মার্চ মাস। সারাদেশে প্রচণ্ড গরম। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোডশেডিং। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যে বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হয়ে এসেছিল, বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় এসেই সেই প্রকল্পগুলো বাতিল করে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংস্কারের কাজও বন্ধ করে দেয়। লোড শেডিং এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ঢাকায় মাত্র ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হয়।

Image result for তারেক ও গিয়াসউদ্দিন আল মামুন

পরিস্থিতি জটিল দেখে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর মূখ্য সচিব ড. কামাল সিদ্দিকীকে নির্দেশ দিলেন দ্রুত কিছু একটা করার জন্য। ড. সিদ্দিকী দ্রুতই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করলেন। কয়েকদফা বৈঠকের পর কামাল সিদ্দিকী একটি প্রস্তাবনা তৈরি করলেন। প্রস্তাবনার মূল বক্তব্য ছিল, কুইক রেন্টালের মাধ্যমে আপদকালীন বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলা। ক্যাবিনেটে মূখ্য সচিব, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় তাঁর প্রস্তাবনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবের ব্যাপারে একটি কথাও বলেননি। বৈঠক শেষ হলো সিদ্ধান্ত ছাড়াই।

দুই দিন পর ড. কামাল সিদ্দিকীকে ফোন করলেন তারেক রহমান। তাঁকে বিদ্যুৎ প্রস্তাব নিয়ে ডাকলেন হাওয়া ভবনে। হাওয়া ভবনের বৈঠকে তারেকের সঙ্গে গিয়াসউদ্দিন আল মামুন। ড. সিদ্দিকী তাঁর প্রস্তাবনা ব্যাখা করলেন। তারেক মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বললেন আমরা সারা দেশে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দিতে চাই, এজন্য আগে দরকার বিদ্যুতের খুঁটি। সারা দেশে আগে বিদ্যুতের খুঁটি সরবরাহের ব্যবস্থা করুন।’

কামাল সিদ্দিকী একটু বিব্রত হলেন। কিন্তু টিপিক্যাল আমলা তিনি। বললেন ‘এটা দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে ভালো। কিন্তু এখনই এদিয়ে কোনো উপকার হবে না। তাছাড়া এক সঙ্গে সারা দেশে খুঁটি লাগিয়ে বিদ্যুৎ দিতে না পারলে, জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে।’

এবার তারেক ক্ষেপে গেলেন। বললেন, আপনি সরকারি চাকরি করেন। ‘জনগণ’ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। অবিলম্বে বিদ্যুতের খুঁটি কেনার ব্যবস্থা করেন। ড. কামাল সিদ্দিকী বুঝে গেলেন ঘটনা কী। কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে এলেন।

এদিকে বিশ্বব্যাংক, বিদুৎ সংকট নিরসনে ১০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে। ড. সিদ্দিকী তাঁর কুইক রেন্টাল প্রস্তাব দাঁড় করিয়েছিলেন মূলত বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বিশ্বব্যাংক বিশাল সহায়তা প্রস্তাব নিয়ে আসে। কিন্তু, বিশ্বব্যাংককে ড. কামাল সিদ্দিকী জানিয়ে দেন, এরকম কুইক রেন্টাল প্রস্তাবে সরকার রাজি না। সরকার সারাদেশে বিদ্রুতায়নের দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তাব নিয়ে কাজ করতে চায়। ড. কামালের কথার ইশারায় বিশ্বব্যাংক কর্তারা বুঝে গেলো কী হতে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, ২০০৩ এর ডিসেম্বরে এক বিবৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুত খাতে অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণা দিল।

২০০৩-০৪ অর্থ বছরে বিদ্যুৎ খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ধরা ছিল ৭২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাঘাবাড়ী ও আশুগঞ্জ কেন্দ্রের বিএমআরইর জন্যই বরাদ্দ ছিল ৫৭০ কোটি টাকা। কিন্তু তারেকের নির্দেশে বাঘাবাড়ী ও আশুগঞ্জের সংস্কার বন্ধ হয়ে গেলো। জানুয়ারি ২০০৪ সালে টেন্ডার ডাকা হলো বিদ্যুতের খুঁটি কেনার। প্রথম টেন্ডারটি ছিল আন্তর্জাতিক দরপত্র। যাতে বিদেশি কোম্পানির টেন্ডারে অংশ গ্রহণের সুযোগ ছিল। গিয়াসউদ্দিন মামুনের হস্তক্ষেপে ওই টেন্ডার বাতিল হয়ে গেলো। টেন্ডার স্পেফিকেশন এমনভাবে করা হলো যাতে শুধু মামুনের কোম্পানি টেন্ডার জমা দিতে পারে। প্রথম বছর বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ৬৮৫ কোটি টাকার খুঁটি কিনল। দ্বিতীয় বছর কিনল আরও ৫২২ কোটি টাকার খুঁটি। আর এই সব খুঁটি সরবরাহ করল একটি কোম্পানি, যার নাম ‘খাম্বা লিমিটেড’। যে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন আল মামুন।

অনেক পরে, ২০০৭ সালে ড. ফখরুদ্দিনের সরকার খাম্বার স্টকলিস্ট করতে যেয়ে দেখল সমুদ্র চুরি। যে দামে সরকার খাম্বা লি. এর কাছ থেকে এসব খুঁটি কিনেছে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তার দাম চারগুন বেশি। তার চেয়েও বড় কথা, যে পরিমাণ ‘খাম্বা’ দেওয়ার চুক্তি হয়েছিল, বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছিল তার অর্ধেকেরও কম। অথচ মামুন সব বিল তুলে নিয়েছিলেন তারেকের ক্ষমতার জোরে।

বাংলা ইনসাইডার

Spread the love
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    20
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন