নতুন বই ‘বিষণ্ণ কল্যাণ মন্ত্রণালয়’ থেকে কবিতা || জেবাউল নকিব

 

রুহ

নির্বাসনের পরে বসবাস গড়ে তুলে ছিলাম একটি গভীর জঙ্গলে। সঙ্গে ছিলো একটি বৃহদাকার পশু, যার কোন নাম নেই। সেও আমার মত একা, তার বুকেও ছিলো অনাহূত বেদনার শোক। শাদ্দাদের সুষুপ্তি বৈভবে তির্যক ঘৃণা ছুড়ে পালিয়ে এসেছে। আমাদের দু’জনের দু’জন ছাড়া আর কেউ নেই। জঙ্গলের পাশে একটি নদী, নদীর ভেতরে থৈথৈ করছে মাছ। একটা মাছ ধরার চেষ্টা করি। ধরে নিয়ে যাই আগুনের উত্তাপে। তখন মনে পড়ে, মাছের প্রাণ আছে। প্রাণ হত্যা পাপ বলে আঁচ লাগার আগে সযত্নে পুনরায় নদীতে ছেড়ে দিয়ে আসি। চোখ যায় বৃক্ষের ফলে… দুটো গোলাপি ফল ছিঁড়ে আমিও পশু সমান ভাগ করে খেতে শুরু করি। খাওয়া শেষে মনে হলো আমার ক্ষিধে রয়ে গেছে। মাছ ধরতে যাই— নদীর গভীর থেকে ভেসে আসছে বেদনার্ত মাছদের সম্মিলিত কান্নার শব্দ, মনে পড়ে প্রাণ হত্যা পাপ। তাই মৃত্যুর নৈকট্যে আয়ুষ্কাল লীন হবার আগে নিজের হাতে কামড় বসিয়ে দিলাম। লক্ষ্য করলাম, শরীরের মাংস লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে! মাংসেরও প্রাণ আছে! পশুটি কাঁদছে, তার নিষ্প্রভ দৃষ্টি’তে ভয়ার্ত চিৎকার। দ্বিতীয় কামড় বসালাম, আমি লাফিয়ে উঠছি না… যথারীতি মাংস লাফিয়ে উঠছে!

 

বুভুক্ষু

পৃথিবীতে কোন সূর্যাস্ত নেই। রাত নেই। পুরো পৃথিবীতে ছায়া দিচ্ছে একটি শিরীষ! শিরীষের উপর থেকে ঝুলছে শক্তপোক্ত দড়ি। সে দড়িকে দোলনা ভেবে আমরা দুলছি। গ্রীষ্মকালে উপর থেকে মেরুন কালারের চকলেট পড়ে। আমরা কুড়িয়ে খাচ্ছি। আর ক্রমাগত ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ছি। দিন দিন চকলেটের স্বাদ লবণাক্ত হতে থাকে। শরত ও হেমন্তের পরে বৃষ্টির মত চকলেট পড়তে থাকে। আমরা দোলনা থেকে নেমে চকলেট কুড়োতে থাকি। ঝুড়ি ভারি হলে বাড়ি ফিরে যাই। তারপর বাড়ি এসে দেখি মা চকলেট রান্না করছেন। জ্বলছে পৃথিবীর একমাত্র শিরীষ বৃক্ষের হাত, পা ও শরীর। মা আমাদের চকলেট খেতে দেন। ভাতের প্লেটে দেখি চকলেট গুলো ক্রমশ জীবিত হয়ে উঠছে। বিহ্বলতা নিয়ে ভেসে উঠছে পীতাভ আলোয়— মানুষ আকৃতির হয়ে উঠছে। ধোয়ার মত একটু একটু করে বাতাসে মিশে যাচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে— ” শুয়োরের বাচ্চা! শুয়োরের বাচ্চা! শুয়োরের বাচ্চা” গালি শুনে আমরা স্থবির হয়ে যাই। হাত পা অবশ হয়ে যায়। কথা বলতে পারি না। মা এসে পুনরায় চকলেট গুলোকে ধরে নিয়ে যান। কেটেকুটে মশলা মাখিয়ে আবার রান্না করতে শুরু করেন। আমরা অধির আগ্রহে শূন্য প্লেটে ক্ষুধার্ত চোখ নিয়ে চকলেটের মাংস খেতে বসে থাকি।

 

 

সর্বংসহা

আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীর পেটে লাথি মারতে মারতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম রং মহলের দিকে। জরায়ুমুখ থেকে টপটপ রক্ত ফোটায় ভিজে যাচ্ছে পথ। অথচ কী বিস্ময়কর সহ্য ক্ষমতা নিয়ে মেনে নিচ্ছে উদগ্রীব হুরুস্তুল লাথি। অবাক হয়ে নির্লজ্জের মত পুনরায় লাথি মেরে ভেঙে দিচ্ছি ক্লিটোরাসের জটলা। ক্ষুধার্ত নখ দিয়ে ছিঁড়ে দিচ্ছি হাত, পা, বুক… ক্রমশ: এগিয়ে যাচ্ছি রং মহলের দিকে। চুলের খোঁপা শক্ত করে ধরে টেনে— হিঁচড়ে ছারখার করে দিচ্ছি, তচনচ করে দিচ্ছি অথচ কী বিস্ময়কর সহ্য ক্ষমতা নিয়ে একটি নারী হাসতে পারে! উল্লাস করতে পারে! লণ্ডভণ্ড হতে পারে! গা-ছমছম ভয়ে, সংশয়ে, উদ্বিগ্নে ও হর্ষে রান্নাবান্না করে— আসবাবপত্র মুছতে মুছতে ভুলে যেতে পারে ভারি পেটের প্রখর বেদনা। সযত্নে পুষতে পারে অদৃশ্য অত্যাচারের নিষ্ঠুর কৌশল। এসবের কিছুই টের পাচ্ছি না… পুনরায় লাথি মারবো বলে উচ্ছ্বাস করছি, ঘন হয়ে আসছে তিমিরাবৃত বসন্তাকাশ— আর একটি নবজাতকের চিৎকার শুনতে পাচ্ছি।

 

তোমাকে ধর্ষণ করার পর

কীভাবে হলো! এই বর্ণানুক্রমে যখন বয়ান করছিলে বীর্যের ঘ্রাণ। বিস্তারিত বলতে বলতে যখন মনে হলো নিমিষেই একটা বৃহস্পতি হতে পারতে অথবা হতে পারতে ছুটির আয়েশী বৈভব। মনের মধ্যে অপরিচিত ব্যাধি— শরীর জুড়ে ব্যথা, তীক্ষ্ণ নখের সুনিপুণ আর্ট। হতে পারতে যেকোন নারীর মত বাধ্যবাধকতা নিয়ে চুপসে থাকা ঘর। ঘরের মধ্যে কালি লেগে আছে, লেগে আছে জলের নেশায় উন্মাদ ফোয়ারা। দেয়ালে দেয়ালে দেখা যায় আঙুলের হাত— হাত বসা ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। তার উপরে ঝুলে আছে তোমার মধ্যবিত্ত শরীর।

একটা সাদা বক উড়ে যাচ্ছে পায়জামার ছেঁড়া ময়ূখ ধরে

 

দ্বিধা

রাত হয়ে গেলে আবছা লাগে
ভাবি— নিগূঢ় থমথমে সময়— যায়
বেরিয়ে পড়ি; তুমি আবৃত করে রাখছো
রাখো— যতটা গুমোট উড়ে আসে
যতটা বেদনা লুকায় শামুকের বুকে

মতামত নিয়ো এলে বর্ণিল ক্ষোভ!
আড়ালে আবড়ালে গোপনে
হাঁটতে থাকি—

হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি পৌঁছে যাই
দেখি কফিনে শুয়ে আছি—
শরীরে বিষ নিয়ে মধু বিলি করে
আর একদল মৌমাছি

 

আদিমানবের ছায়াপুত্তলিকা

কোথায় যাচ্ছো মেঘ?
কাকে রাঁধো, খাও ছিঁড়ে

হারিকেন হাতে সব প্রেমিকার ভুল পথ যাত্রা
সন্ধ্যা খেলে সাদাচোখে রঙিন চশমা’র ঘোর
সুখটান নষ্ট গন্ধ নিয়ে

জন কোলাহল ঠেলে ধীরে বাইপাসে থামো মেঘ
নরককুণ্ডে ঢালো তাপ
গর্তে বাজুক সুখপাঠ
উঠো— রাত হলে মানুষ
সমূহ ভিন্ন শরীর— পাপ

দেখো হিংস্র আদিমানবের ব্যাপক ছায়াপুত্তলিকা

 

গাছ

আমার পায়ের নিচে শতবর্ষী শেকড়
তার নিচে মাটি.. বিস্তৃত আঁকড়ে—
মাটিতে পিষে আছে আদিম কংক্রিট
—উঠতে চায়
সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে ও হাঁটতে চায়—

পায়ের নিচের শেকড় গুলো কাঁদছে

 

নৈরাশ্য

বৃদ্ধ গাছ থেকে ঝরে পড়ছে রসালো আঠা
নারী গাছের ফিটনেস দেখে লোভনীয় দৃষ্টি
দেখায় দূরের শিরীষ। কালো আবৃত খোসায়
অন্তিমসূর্য এঁকে দিচ্ছে ভ্রাম্যমাণ কপোত।
হারিকেন সন্ধ্যায় গাছদের পূর্বপুরুষ
কাকে যেনো চিৎকার করে বলছে….

মনের মধ্যে বিরাট ক্ষুধা
গলায় ঝুলছে মধ্যবিত্ত সাপ, বাপরে বাপ!

 

 

বিষণ্ণ কল্যাণ মন্ত্রণালয়
কবিঃ জেবাউল নকিব 
প্রকাশনী: চন্দ্রবিন্দু
প্রচ্ছদ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

বইটি পেতে কল করুন: 01716804839

Spread the love
  • 23
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    23
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন