ভাতিজার চোখে ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু’।।অনুবাদঃ মাহমুদ মিটুল(৩য় পর্ব)

১৯২১ সালে ক্যামব্রিজে ভর্তি এবং আই.সি.এস. থেকে পদত্যাগ

 

ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সময়ই সুভাষ চন্দ্র জানতো যে সে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য খামোখাই আটটি মাস নষ্ট করতে যাচ্ছে। তাছাড়া, বয়সের হিসেবে এটাই ছিলো তাঁর শেষ সুযোগ। ক্যামব্রিজে ভালো কলেজে ভর্তির বিষয়টিও ছিলো অনেকটা অনিশ্চিত। কারণ, সে ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর আগেই একাডেমিক ইয়ার শুরু হয়ে গিয়েছিলো। ইন্ডিয়া হাউজের ভারতীয় ছাত্রদের পরামর্শকের সাথে কথা বলে হতাশ হয়ে তিনি সরাসরি ক্যামব্রিজে ভর্তির চেষ্টা করলেন। সেখানে ফিজউইলিয়াম হল-এর সেনসর তাঁর বিষয়টি খুব আন্তরিকতার সাথে দেখলো এবং তাঁকে ভর্তি হয়ে জুন ১৯২১ সালের পরবর্তী ডিগ্রি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি দিলো। এদিকে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা সন্নিকটে চলে আসছিলো এবং তিনি এর জন্য পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করলেন। ক্যামব্রিজের মেন্টাল এন্ড মোরাল সায়েন্স পরীক্ষার জন্য ক্লাশে অংশগ্রহণ ছাড়া আর তেমন কোনো পড়াশুনা করতে পারলেন না। পড়াশুনার বাইরে তিনি ইন্ডিয়ান মজলিস ও ইউনিয়ন সোসাইটিতে অংশগ্রহণ করতেন।

ইংল্যান্ডে যে বিষয়টি তাঁকে মুগ্ধ করেছে তাহলো, এখানকার ছাত্রদের স্বাধীনতা, সম্মান ও মর্যাদা উপভোগ। সে মনে করতো যে এটা ছাত্রদের চরিত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে। ভারতীয় ছাত্রদের বেলায় চিত্রটা ছিলো উল্টো। তারা সবসময় সন্দেহ ও জরিমানার মধ্যে থাকতো; তাদেরকে অবজ্ঞা করা হতো অথবা পুলিশ তাদের বিপ্লবী বলে তাড়িয়ে বেড়াতো। ক্যামব্রিজের ইউনিয়ন সোসাইটিতে বিতর্ক অনুষ্ঠানে ছাত্রদের তাদের মত নির্দিদ্বায় প্রকাশের স্বাধীনতা ছিলো যদিও সেখানে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীরা উপস্থিত থাকতো। ইংলিশদের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য তাঁকে আকৃষ্ট করে এবং সেগুলো নিয়ে তিনি তাঁর দেশের বন্ধুদের কাছে লিখতেন। প্রথমত, ইংলিশরা সময়ের ব্যাপারে কঠোর এবং ঘড়ির কাঁটার সাথে মিলিয়ে কাজ করে। দ্বিতীয়ত, তারা ভীষণ আশাবাদী এবং দুঃখে ডুবে না থেকে বরং জীবনের ভালো দিকগুলো নিয়ে ভাবনাকেই প্রাধান্য দেয়, যেখানে ভারতীয়রা সম্পূর্ণ উল্টো। তৃতীয়ত, তাদের কাণ্ডজ্ঞান চমৎকার, ফলে পরিস্থিতি বিবেচনায় দক্ষ। শেষতক, তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে তাদের জাতীয় স্বার্থকে সব চেয়ে এগিয়ে রাখে এবং নিজের দেশকে কখনো নিচু হতে দেয় না।

সুভাষ চন্দ্র ক্যামব্রিজে থাকাকালীন সময়ে ব্রিটিশ ও ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে সম্পর্ক সামগ্রিকভাবে ভালো ছিলো। কিন্তু সে সম্পর্ক বাস্তবে খুব গভীর ছিলো না বা বন্ধুত্বে পরিণত হতো না। সাধারণ ব্রিটিশদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের ভাব বজায় ছিলো এবং ভারতীদের মনে তখন যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা ও জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দগদগে ছিলো। সাধারণ মধ্যবিত্ত ব্রিটিশদের মধ্যে জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সহানুভূতি থাকলেও বিষয়টা ভারতীয় ছাত্রদের কষ্ট দিতো। ফলে সুভাষ ও তাঁর বন্ধুদের এই ভাবনা স্বাভাবিক ছিলো যে ব্রিটিশ ও ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে দুএকটা ব্যতিক্রম ছাড়া আসলে কোনো বন্ধুত্ব নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুধু লেবার পার্টির লোকজন ভারতীয়দের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলো। রাজনৈতিক দল ছাড়াও সুভাষ দেখলো যে তাঁর ব্রিটিশ বন্ধুরাও রক্ষণশীল ধারণা পোষণ করে। জাতিবৈষম্যের ভিত্তিতে ভারতীয় ছাত্রদের উপর অবিচারের একটি নমুনা তাদের সামনে হাজির হলো যখন তাঁরা ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং করপস-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন করলো। বিষয়টি ঘটে যাওয়ার পর ইন্ডিয়া অফিস ও ওয়ার অফিস ভারতীয় ছাত্রদের অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়টি নিয়ে একে অন্যকে দোষারোপ করলো। আন্ডার-সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া-র সামনে বিষয়টি উপস্থাপনের সময়ে সুভাষ দলের নেতৃত্ব প্রদান করলো। ঘটনার আসল রহস্য ছিলো অফিসার্স ট্রেনিং করপস-এর সদস্য হিসেবে একবার মনোনিত হলে সে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কমিশনার হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারতীয় ছাত্ররা যদিও তাদের আশ্বত করেছিলো যে তারা কমিশনার হতে চায় না, তারা কেবল ট্রেনিং-এ অংশ নিতে চায়, তবুও কর্তৃপক্ষ তাদের কথা বিবেচনা করেনি।

ইংল্যান্ডে সুভাষের জীবন তাঁর বন্ধুদের কাছে পুরোহিতের জীবন বলে মনে হতো। একই সাথে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ও ক্যামব্রিজের পরীক্ষার প্রস্তুতির মতো দুটি কাজ তাঁকে একটুও বিশ্রামের সুযোগ দিতো না। এছাড়াও, সুভাষের মানসিক অবস্থা ছিলো জীবনের প্রতি বিমুখ ও অবহেলার এবং যা আরো অনেক বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় ছাত্রদের জীবন নষ্ট করে দিয়েছিলো। এটা বলা হয়ে থাকে যে সুভাষের শারীরিক উপস্থিতি পথভ্রষ্ট ওইসব ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি প্রদান করতো। তিনি তাঁর বন্ধুদের বাসায় নিয়মিত যেতেন এবং জীবন সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ও ইংল্যান্ডের অবস্থা তাদের বলতেন। ভারতীয় কোনো বিশিষ্ট্য ব্যক্তি ইংল্যান্ডে আসলে এবং কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা ইন্ডিয়ান মজলিশে বক্তৃতা প্রদান করলে সুভাষ ছিলো তার উদ্যমী আয়োজক। ভারতীয় কোনো বক্তা তাঁকে আলাদা করে উল্লেখ করলে তিনি খুব গর্ব বোধ করতেন। এখানে উল্লেখ্য যে কতোটা গর্বের সাথে তিনি তাঁর এক ভারতীয় বন্ধুকে চিঠিতে সরোজিনি নাইডুর কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি ওই বন্ধুকে জানিয়েছেন যে তিনি নাইডুর পাণ্ডিত্য, প্রেরণা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং পশ্বিমা বিশ্বে এক ভারতীয় নারী হিসেবে তাঁর দৃপ্ত পদচারণা দেখে কতোটা মুগ্ধ হয়েছিলেন।

সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য অনেকগুলো বিষয়ের উপরে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয় যাতে করে বাস্তব জীবনে একজন দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে যোগ্য হয়ে ওঠে। এর নয়টি প্রধান বিষয়ের মধ্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইংরেজি, ইতিহাস ও আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস উল্লেখযোগ্য। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি কালে সুভাষ শুধুমাত্র আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস পাঠেই ইউরোপ মহাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর মনে হতে থাকে যে ভারতীয়দের ব্রিটিশদের চোখে মাহাদেশটি দেখার বিষয়টি শিখানো হয়। মহাদেশটির মূল ইতিহাস পাঠ করে সুভাষ চন্দ্র আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে সঠিক ও নতুন আত্মোপলব্ধিতে পৌঁছান। এটাই তাঁর পরবর্তী জীবনে স্থিতি অর্জনে সহায়তা করে।

ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ১৯২০ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়ে এক মাস যাবত চলে। সুভাষ কলকাতায় তাঁর পরিবারকে জানায় যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী নন। এরপর তিনি পরবর্তী বছরের ক্যামব্রিজের পরীক্ষার জন্য পরিকল্পনা করেন। ওই সময়ের মধ্য সেপ্টেম্বরের এক রাতে তিনি তাঁর এক বন্ধুর আকস্মিক অভিনন্দনসহ টেলিগ্রাম পেয়ে বিস্মিত হন। পরবর্তী সকাল বেলা ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের তালিকায় তিনি তাঁর নাম দেখতে পান। মেধা তালিকায় তিনি চতুর্থ অবস্থানে ছিলেন। নম্বরপত্র হাতে আসলে দেখা যায় যে ইংলিশে তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন। অবশেষে, তথাকথিত স্বর্গীয় চাকুরি যা তৎকালীন সময়ের অনেক ভারতীয় তরুণদের কাছে চূড়ান্ত স্বপ্ন ছিলো এবং তাঁর পরিবারের সবার কাম্য ছিলো, তাঁর মুঠোয় চলে আসে।

পরিহাসের বিষয় হলো, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সফলতা সুভাষকে জীবনের সবচেয়ে বড়ো সংকটের সামনে এনে হাজির করে। তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে তিনি তাঁর জীবনে অর্জিত আদর্শ ও নীতির বিপরীতে চলে গেছেন এবং তিনি স্বর্গীয় চাকুরির লোভের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছেন। তিনি তাঁর বড়ো ভাই শরৎ চন্দ্রকে দীর্ঘ চিঠিতে মনের সমস্ত কথা লিখলেন এবং তাঁর পরামর্শের জন্য অনুরোধ করলেন। তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকেও চিঠি লিখে জানালেন যে তিনি চাকুরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তাঁর (দেশবন্ধুর) নেতৃত্বে দেশের সেবা করতে চান।

১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯২১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বড়ো ভাই শরৎ চন্দ্রকে লেখা চিঠিগুলো থেকে দেখা যায় যে নিরন্তর ভোগান্তি ও দারিদ্রতায় নিমজ্জিত মানুষের জন্য সংগ্রাম করার আদর্শ এবং সিভিল সার্ভিসের আরামদায়ক জীবনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সহ্য করা তাঁর জন্য কতোটা কঠিন ছিলো। এই দীর্ঘ সাত মাস ধরে তিনি পারিবারিক ও উপার্জনের সম্ভাব্য সকল বিষয় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন। তিনি জানতেন যে পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই তাঁর চাকুরি ছাড়ার ব্যাপারটা সহজভাবে নেবে না। তাঁর পিতা জানকীনাথ ভাবতেন যে ভারতীয়রা নিজেদের দেশ পরিচালনার জন্য বেশ যোগ্য হয়ে উঠেছে এবং তা দশ বছরের মধ্যেই সম্ভব হবে। তাই তিনি মনে করতেন যে নতুন রাজত্বে সিভিল সার্ভিস চাকুরি জীবন অসহনীয় হবে না। এর উত্তরে সুভাষ বলেছিলেন যে ভারত নিজেদের শাসন ক্ষমতা দশ বছর বা তার কম সময়ের মধ্যেই হাতে পেতে পারে, একমাত্র যদি আমরা তার জন্য যথেষ্ট মূল্য পরিশোধ করতে পারি। তাঁর মতে এই মূল্য হবে দেশসেবা, আত্মত্যাগ ও কষ্টভোগ করা। এই অবস্থায় আমরা যদি নিজেদের বিদেশী আমলাতন্ত্রের তুলে দেই এবং সামান্য লোভের কাছে বিক্রি হয়ে যাই, তাহলে ভারতের স্বাধীনতা কাছাকাছি আসার পরিবর্তে বরং দূরে সরে যেতে থাকবে। এমতাবস্থায় সুভাষের কাছে এটা একটা মৌলিক প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসে যে কোনটা উত্তম- স্বাধীনতার পথে সেবা, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের জীবন বেছে নেওয়া নাকি ভারতে বিদেশী শাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করে দাসত্ব মেনে নেওয়া।

সুভাষ জানতেন যে পরিবারের লোকজন তাঁকে অস্বাভবিক লোক হিসেবে বিবেচনা করবে। চাকুরি ছাড়ার পর বাড়িতে যে শোরগোল তৈরি হবে তা তিনি তখন কল্পনা করতে পারলেন। কিন্তু তিনি পরিবার বা সমাজের বিরুদ্ধতা নিয়ে ভাবিত ছিলেন না। তিনি সুনিশ্চিত ছিলেন যেকোনো সিদ্ধান্তে বড়ো ভাই শরৎ বসু তাঁকে সমর্থন দিবে, যেভাবে সে সব সংকটের সময়ে দিয়ে আসছে, এমনকি যেখানে “স্বজনদের আর কেউই আমার অদ্ভুত পরিকল্পনাকে সমর্থন করেনি।” তাঁকে যে বিষয়টা ভাবিয়েছিলো তাহলো, চাকুরি ছাড়ার সিদ্ধন্ত তাঁর বয়স্ক ও অসুস্থ পিতামাতাকে আহত করবে। পিাতামাতাকে এটা বুঝানোর ব্যাপারে সে ভাই শরতের উপর নির্ভর করলো যে দেশের স্বার্থে তাদের ছেলে সামনে এগিয়ে এতে নিজেকে উৎসর্গ করছে যার বিনিময়ে ভারতের স্বাধীনতা আসবে এবং এই উৎসর্গ হতে হবে সচেতনভাবে এবং সুচিন্তিত। তিনি তাঁর ভাইকে আরো জানান যে পড়াশুনার জন্য বিদেশে যে টাকা তিনি খরচ করেছেন তাকেও দেখতে হবে এমনভাবে যে কোনো ধরনের আকাঙ্ক্ষা ছাড়াই মায়ের পায়ে ওগুলো নিবেদন করা হয়েছে। চাকুরি ছাড়ার তিন সপ্তাহ পূর্বে ১৯২১ সালের এপ্রিলে ভাইকে লেখা চিঠিতে তিনি সারসংক্ষেপে জানিয়েছিলেন যে কেনো তাঁর ভিতরের নীতি ও যুক্তির দ্বন্দ্বের সমাধান হচ্ছে না। তিনি লিখেছেন: “আমরা যারা একদেকে স্বামী বিবেকানন্দ ও অন্যদিকে অরবিন্দ ঘোষের প্রভাবে বেড়ে উঠেছি, ভাগ্যক্রমে বা দুর্ভাগ্যবশত এমন মানসিকতা লাভ করেছি যা সম্পূর্ণভাবে বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আপোষ করতে পারে না।” তিনি এজন্য দুঃখিত যে একটি সুসংবদ্ধ পরিবারে তিনি অনৈক্যের সৃষ্টি করেছেন। কারণ হলো এই যে কিছু ধারণা তাঁর মধ্যে বদ্ধমূল হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা ছিলো অন্যদের কাছে অগ্রহনীয়।

১৯২১ সালের ২২ এপ্রিল সুভাষ চন্দ্র বসু ক্যামব্রিজ থেকে সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া, ই. এস. মন্টিকে লিখিত আবেদন করলেন যে, সে যেনো ১৯২০ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের তালিকা থেকে তাঁর নাম প্রত্যাহার করে।

চাকুরি ছাড়ার ব্যাপারে মোটামুটি মনস্থির করার পর ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে সুভাষ বসু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকে দুটি ঐতিহাসিক চিঠি লিখেছেন। এর আগে ১৯১৬ সালে মি. ওটেনের ঘটনার সময়ে তিনি খুব অল্প সময়ের জন্য দেশবন্ধুর সাথে দেখা করেছিলেন। এখন সুভাষ দেশবন্ধুকে ‘বাংলার দেশ সেবকদের পুরোহিত’ বলে সম্বোধন করছেন এবং অকপটে তাঁর নেতৃত্বে দেশ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন। তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস সংঘঠনটি সম্পর্কে তাঁর ধারণা পরিষ্কার ভাষায় প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন যে, প্রথমত, কংগ্রেসদের নিজেদের একটি কার্যালয় থাকতে হবে; দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসে ছাত্রদের গবেষণার একটি দল থাকতে হবে যারা জাতীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণের কাজ করবে। কংগ্রেসকে মুদ্রা ও বিনিময় বিষয়ে তাদের নীতিমালা পরিষ্কার করতে হবে; তৃতীয়ত, কংগ্রেসকে দেশের বিভিন্ন রাজ্যগুলো নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে হবে; চতুর্থত, কংগ্রেসকে পুরুষ বা নারীদের সার্বজনীন ভোটাধিকার বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে; পঞ্চমত, কংগ্রেসকে দলিত সম্প্রদায়ের উন্নয়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে। সর্বোপরি, সুভাষ দেশবন্ধুকে জানান যে উপরের কাজগুলো করার জন্য কংগ্রেসকে স্থায়ী কর্মী নির্বাচন করতে হবে এবং প্রত্যেকটা সমস্যার ব্যাপারে আলাদা নীতি নির্ধারণের জন্য তথ্য সংকলণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সুভাষ চাচ্ছিলেন কগ্রেসের যেনো গোয়েন্দা ও প্রচার বিভাগ চালু করে। ভারতের জাতীয় জীবনের সকল বিষয় নিয়ে সবকটি ভাষায় পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়েছিলো।

সুভাষ নিজে তিন ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য দেশবন্ধুর কাছে আগ্রহ প্রকাশ করলেন: প্রথমত, দেশবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল কলেজে শিক্ষকতা করা; দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকতা করা, বিশেষ করে স্বরাজ পত্রিকার ইংরেজি সংস্করণের জন্য; এবং তৃতীয়ত, কংগ্রেস সংগঠনের জন্য গবেষণার কাজ। সর্বোপরি, তিনি দেশবন্ধুকে লিখে জানালেন যে কংগ্রেসের অবশ্যই ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধানের জন্য নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর তিনি স্বরাজের ভিত্তিতে ভারতের নতুন সংবিধান প্রণয়নের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।

ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস থেকে সুভাষের পদত্যাগ ইংল্যান্ডে ভারতীয় কমিউনিটির মধ্যে দারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। খবরটা দ্রুত ভারতে চলে আসে এবং দেশব্যাপী আলোচনার এক উত্তেজনাকর বিষয়ে রূপ লাভ করে। সুভাষ নিজে এই চাঞ্চল্য বা জনতার সাধুবাদকে এড়িয়ে যেতে চাইলেন- মূলত তিনি চাইতেন যে বিষয়টা আত্মবিসর্জনেই সীমাবদ্ধ থাকুক। এমনকি তিনি তাঁর ভাই শরৎ চন্দ্রকে বলেছেন: “আপনার চিঠিতে আপনি আমাকে নিয়ে অনেক উদার কথাবার্তা লিখেছেন, আমি জানি যার সামান্যই আমি ধারণ করি…আমি আসলে যা বলতে চাই তহলো, আপনাকে নিয়ে আমি গর্ব বোধ করি।” যাহোক, তিনি আরো উল্লেখ করেছেন: “আমি জানি, কতো হৃদয় আমি ভেঙেছি, আমার কতো গুরুজন যাদের আমি শ্রদ্ধা করি এ অবস্থায়, কিন্তু তাদের কথা রাখতে পারিনি…আমার একমাত্র চাওয়া হলোÑ আমার এই কৃত কর্মগুলো দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনুক।” পরিশেষে, তাঁর মায়ের কাছ থেকে চিঠি পেয়ে তিনি স্বস্তি বোধ করলেন যেখানে তিনি লিখেছেন যে অন্যরা যাই ভাবুক না কেনো ‘তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শকেই পছন্দ করেন’।

সমস্ত মেঘ কেটে গেলো। সুভাষ চন্দ্র কোনো কিছুর সাথে কোনো আপোষ না করে সবকিছু দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করলেন এবং আদর্শ ও নৈতিক কর্মকাণ্ডকে গ্রহণ করলেন। তিনি আর কখনো পিছনে ফিরে তাকাননি।

Spread the love
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    16
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন