একগুচ্ছ কবিতা || শুভ্র সরকার

আনতি দূরে

শুক্রবারের সকাল আজ
প্রবাহমান সকল এতটা সুন্দর
যেন নিরন্তর চমকানো ডেগারের মাথায়
জেগেছে আকাশ-

ডোবার জলে মাছরাঙা মিনতি জানায়
তার মাঝে ভেজাবাঁশ; জলে ভাসা আয়ূ

অতি হাওয়ায় নুয়ে আছে ধানগাছ
পেতে রাখা প্রথাগত খড়
যেন হলুদশব

হঠাৎ কোথাও অতীত হয়ে যায়
রেণুর স্বর আর ঘুঘুর ডাক-

 

বাবার জন্য একগুচ্ছ

সকল ফুল শুনতে পায়
বাতাসের সুরসন্ধি
কিংবা আলো স্পর্শে খুঁজে পায়
রঙের গরিমা

যেখানে নীলচে পৃথিবীর কোথাও হয়তো
আমাদের বাড়ি-

এলোমেলো দাঁড়ানো সমস্ত ফুলের গাছ
ঝুকে বেঁকে ওঠা পাতারা নির্জন
রোল কল ডেকে ডেকে
পাখিরা এক গাছ থেকে অন্য গাছে চলে যায়

ধরো এমন রাতের পরে
গোপন পরীরা ফোটিয়ে গেছে যত ফুল
খুউব ভোর তাতে অদ্ভুত হয় জেনো

তবে রঙ্গনের ঠোঁট ভরা
অনেকটা দিন ধরে রাখা থাকে
লাল লাল ফুটকি

মা অসুস্থ বলে-
বাবা আজ পূজার জন্য ফুল তুলছেন
সাথে ভাসিয়ে দিচ্ছেন
পুকুরের জলে
ঠাকুরের আসনে গত হওয়া ফুল

 

 

পাহারাদার

সারটা দিন বাড়ির পাহারাদার হয়ে আছি
আমাদের ছোট বাড়ি
শুয়ে বসে এইখানেই সম্ভাবনা পুষি

শহর খানিক দূরে-
গাড়ির হর্ণের শব্দ শুনি
শুনি পথ হাঁটা মানুষের ফিসফিসানি
তবুও একলা আমি একলা ঘরে
নীরবতার মানে বুঝি

যাই হোক, ওলের মতো রোদ নরোম
দুপুরটা ভীষণ একঘেঁয়ে
মায়ের রেখে যাওয়া অসুস্থ হাঁস
ঝিমানো অলস মোহন ঘাড়
কেমন জানি গন্ধময় খোপের চারপাশ

আর একটি দোয়েল ধূলির গায়ে
সৌন্দর্য খুউব
ছিটিয়ে দিচ্ছে শিস

যদি ভাবি এভাবেই-
বার্নিশ ছাড়া কাঠের টুলের উপর
প্যারাসুট নারিকেল তেলের বোতল
দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষায় সূর্যের

 

ধীরাশ্রম

মানুষগুলো চলে গেলে বাসনার পরে
আরো দূর- লোহার গতি বহে ছায়ায়
উজানে ফণা তোলা রোদ

গতিমুখে ট্রেন কোথাও না কোথাও যায়
চোখ বন্ধ করে ভাবছি তখন
স্তুপীকৃত পাথুরে ঝনঝন
ওইখানে ফুলদল; ভ্রমরা সরল
জঙলায় ছড়ানো পাতার মুখবেজার
খাদের কাদাজলে শিশুরা করছে স্নান
পতিত জমিনের পাশে জালিধান

এখানে শীতসকাল
জমানো প্রাচীন ঘর
গরু ও ঘাস খুলে দিচ্ছে টেকের মাঠ
আলোর দিকে দিগন্ত অপার
আর কলার বাগানজুড়ে খুবলে ধরা বাতাস

এই ছোট স্টেশন ধীরাশ্রম
কত গল্পের কাঠের বেঞ্চ
মাটিমুখে ঝুকে আছে পায়া নড়বড়
তার ক্ষয়ে জড়ানো বহুকাল
যেন নির্জনতায় রেখে গেছে কেউ
অপেক্ষা আনমন-

 

 

জাগানিয়া

লেতি আর মৌন লাটিম
অনভ্যাসে পড়ে আছে। জড়ানো উঠোনজুড়ে
আমাদের শৈশব।

ঐখানে ভরদুপুর স্কুল
রোদ লেগে আছে নড়বড়ে জানালায়
সম্মুখে তেঁতুল গাছ পাখিদের কাকলি নামায়
আর টাঙানো ছুটির ঘন্টা দেখে
শিশুদের ব্যাকুল হয়ে থাকা
ভাষাভর্তি চোখ

আড়াবন আমবাগান ঘুরে ঘুরে
মশারি পেতে আছে তরুলতায়

তোমাদের বাড়ির সামনে
শিবজটা ফুল বাতাসে বাড়ে
পালই শাক তরতরিয়ে ছড়িয়ে বাড়ে পুকুরপাড়ে

পশ্চিমে জোড় খোলা শরতের আকাশ
ডেফলমেঘ
উড়ে যাওয়া বকের দাম্পত্য
গড়িয়ে যাচ্ছে কোথাও

 

 

ট্রেন ও সম্পর্কের চারপাশ

এক
ও শহর ওড়ো শহর
পেরিয়ে আরো দূর
গ্রামের পর গ্রাম
যেখানে সবুজে সবুজে নির্মলাভাস
কিছুদূর আঁধারের সেলাই খুলে
আলোর ভাঁজ
ঝুলে আছে বকফুল
পরষ্পর আকাঙ্খায়
সে রঙিল তরঙ্গ তুলে
বাতাসে ভাঙছে শিয়ালমতির
দুূর্বোধ্য আড়াল

ও ট্রেন সঙ্গে নিয়ে স্বর
কতদূর গাছেরা উল্টো পড়ে
ঝাপসা দেখায়
শুধু কাঁপে ঝোপঝাড় নির্জনতা
কখনো জাগে অমনি এক উদ্ভাস

ও ট্রেন নিয়ে যাও, নিয়ে যাও
তবে কোথাও-
এইসব ঝিমানো ও তড়পানো
কূটভাব গুজে নিয়ে
আমার যে বেলা বয়ে যায়

ও ট্রেন ভেঙে বাক্
সঙ্গে নিয়ে তোমার স্বর
নিরীহ শয়ে শয়ে পাতার
ঝরে গেছে যে দীর্ঘশ্বাস
ধুতুরার নির্জনে-

যেতে যেতে মনে হয়
যেন তুমি বায়ূর পিঠেও চাবুক ছড়াও

দুই
যেন আলো আর ছায়া জাগানো সার্কাস
জানালা আর দরোজা মাড়িয়ে
রোদ মুখখানি বাড়ায়

এলো দুপুরের কাল
নিদারুণ তাপ ও তেজ একসঙ্গে দাঁড়ায়

চিরকাছে ডোবা নয়তো জলাশয়ের পাশে
উপচানো কাশফুলে ফর্সা টলে
নুয়ে পড়ে নলখাগড়ায়

দেশ থেকে দেশে
ধানগাছের নিচে শয্যা পেতে
আগাছা শুয়ে থাকে মাতৃছায়ায়

দূরে দিগন্তের ধার ঘেঁষে ধানক্ষেত
কৃষকের হাতে আগাছা অর্বাচীন চিরকাল

 

 

প্রেমিকার পুরনো বাড়ি পার হয়ে যাই

বহু বছর পরে
আজ শাঁখারিবাজার আইলাম
গলি গলি ঢুকলাম

একসময় এইখানে –
পুরনো প্রেমিকা থাকতো
লাকা বানরের মতন আমার নাচতো মনের টংঘর

গুজব আছিলো এমন-
আমি নাকি তারে নিয়া
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ঘুরতে গেছিলাম
হুদা কথা হাছা অইলে
বাতাস পিছনে পড়ে থাকে যেমন

এইসব রটে যাওয়া কথায়
আমি বরং সুখ পাইছিলাম

আজ বহুবছর পরে
ফেলে আসা দিন ভাবনা ছেড়ে গেলে
আফসোস ঘিরে থাকে সারাক্ষণ

প্রেমিকা তোমারে মনে কইরা
তোমার পুরনো বাড়ি পার হইয়া যাই….

 

 

বাবার চোখে আমি

বাবার চোখে আমি এক অপদার্থ

এ কথা শুনে শুনে
কবে থেকে যে
আমারও নামের পাশে সম্পর্ক নিয়ে
জড়িয়ে গেছে অপদার্থ

অথচ বাবার মুখের দিকে
তাকিয়ে কখনই মনে হয় নি যে
বাবা আমার বেদনা জমিয়ে রেখেছে
অভিমানের তর্জনিতে-

এই যেমন কিছু না করার দুপুরে
কিছুই না হওয়ার পৃথিবীতে
বাবা আমি এক বনোফুল, জানোনা তুমি
যা কেউ কখনো কিনতে আসবে না
ভালোবেসে, ব্যাকুলতা হাতে ঝুলিয়ে…

 

 

বিরুদ্ধকথা

আমি ভেতরে পুরে নিতে চেয়েছি
এইসব সাবলীল পরশ আকর
আর আকাঙ্খার লুকনো মহিমা

আজ তোমার বিবিধ বায়না
পিঠে আমার
বস্তুত, লোভের লহরে আমি নই
যেভাবে আলিঙ্গন করো সম্পদ

এবং যদি কখনো আত্মহত্যা করি
অভাবের ছায়া মুছে দিয়ে
তখন মৃত্যুকে না জেনেই উড়িয়ে দিয়েছি
ভেবো, সকল আবেগের ঋণ

কিন্তু আমি মিলিয়ে নিয়েছি
পরিস্থিতি কেবল, তোমাকে বলাবে
সম্পদ নয় যেন
তুমি ফিরে পেতে চাও আমাকেই

আফসোস, যখন আমার কাছে
এমন কিছু থাকবে না
যা মানুষ পর্যন্ত চলে
এর পরে আর নয়

 

 

যেন বহুদিন

ফুলের দূরত্বে বাড়ে লতিকা কচুর

এ হাওয়ার ছটা চুপচাপ

বিলি কেটে যাওয়া আঙুলের
মেয়েটার-
ঘুমদানা দুপুর
মায়ের চুলের মাথা জুড়ে মায়া হয়

পথের পাশে পথ নয়
বসে থাকে গাছ
কখন যে রোদ ডিঙিয়ে ছায়ার ভঙিমায়
এতিম লাগে- মান্দারে
ডুবে হারানো বিকেল

এতদূর ফেলে আসা সটান উঠোন
শিশুটির লাল বলের দিকে তাকিয়ে
একটি লাল জবা ফুল
ঝরে যেন সম্পর্কের হিংসায়

Spread the love
  • 56
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    56
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন