ভাতিজার চোখে ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু’।।অনুবাদঃ মাহমুদ মিটুল(৫ম পর্ব)

৫. স্বরাজ আন্দোলন এবং বার্মায় নির্বাসন

সুভাষ চন্দ্র এবং দেশবন্ধুর অন্যান্য অনুসারীগণ গয়া কংগ্রেস থেকে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাংলায় ফিরে আসেন। তাঁরা দেখতে পেলেন যে তাঁদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, কারণ দলের চালিকা শক্তি তখন রক্ষণশীলদের (নো চেঞ্জার্স) হাতে চলে গেছে যারা ছিলো তখনকার সময়ের সংখ্যাগুরু। এমনকি তাঁদের কাছে কোনো তহবিল পর্যন্ত ছিলো না। কিন্তু স্বরাজ পক্ষ বিচলিত না হয়ে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে থাকলেন এবং কংগ্রেস সমর্থকদের মাঝে প্রচারণা চালাতে থাকলেন। একদিকে সুভাষ চন্দ্র ও অন্যান্য কর্মীরা তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছিলেন এবং অন্যদিকে দেশবন্ধু ও প-িত মোহিত লাল সারাদেশ সফর করে বেরিয়েছেন। ১৯২৩ সালের মাঝামাঝি এসে স্বরাজ পক্ষ ও ‘নো চেঞ্জার্স’ পক্ষ সমতায় চলে আসে। শেষপর্যন্ত, দিল্লিতে সেপ্টেম্বর মাসে কংগ্রেসের এক বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে স্বরাজ পক্ষ সেদিন বিজয় লাভ করে এবং একটি নতুন প্রতিবিধান পাস করা হয় যেখানে কংগ্রেসকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও আইনসভার মধ্যে থেকে সরকার বিরোধীতা চলমান রাখার অনুমতি প্রদান করা হয়। নির্বাচনে স্বরাজ পক্ষ অসাধারণ সফলতা লাভ করেছিলো। প-িত মোহিত লাল কেন্দ্রীয় অধিবেশনে দলের নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং দেশবন্ধু নেতৃত্ব দেন বেঙ্গল কাউন্সিলের। দেশবন্ধু দিল্লি সম্মেলনের পরে কলকাতায় তাঁর ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ‘ফরওয়ার্ড’ প্রকাশ করেন এবং সুভাষকে এর সাথে যুক্ত করে নেন। অল্প সময়ের মধ্যে ‘ফরওয়ার্ড’ হয়ে উঠেছিলো সারা দেশের অন্যতম প্রধান জাতীয়তাবাদী পত্রিকা।

একদিকে সুভাষ তাঁর সমস্ত কাজে স্বরাজ দলে দক্ষ ভূমিকা পালন করেন এবং একই সাথে অন্যদিকে তিনি যুব সংগঠনকে তাঁর পরিকল্পনা অনুসারে সামনে এগিয়ে নেন। তিনি সর্ব বাংলা যুব লীগ গঠন করেন, তিনি ছিলেন যার নির্বাচিত সভাপতি। সারা দেশব্যাপী যুব সংগঠনগুলোর জন্য এই লীগ হয়ে উঠেছিলো মডেল সংগঠন। তবে সুভাষ চন্দ্র যুব সংগঠনটি রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য হাশিলের লক্ষ্যে বা রাজনৈতিক আন্দোলনে যুবকদের ব্যবহারের লক্ষ্যে গঠন করেননি। শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, বৌদ্ধিক এবং মনঃস্তাত্বিকভাবে যুবকদের দেশের জন্য প্রস্তুত করার মূলনীতির ভিত্তিতে ভারতীয় সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন এবং নতুন এক ভারত তৈরি করে ‘পৃথিবীকে এই বার্তা প্রদান করা যে এটাই হলো ভারতের অতীত ঐতিহ্য’। এই আদর্শকে সামনে রেখে যুকশক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুভাষ চন্দ্র বাংলার সব জেলা ও এলাকায় ক্লাব-এসোসিয়েশন গঠনের জন্য তরুণ নারী-পুরুষদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

১৯২৩ সালে শেষদিকে বেঙ্গল প্রোভিন্সিশিয়াল কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ প্রদানের মাধ্যমে সুভাষকে দলের গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিলো।

১৯২৪ সাল স্বরাজ দলের জন্য আশাবাদ নিয়ে শুরু হয়েছিলো। কলকাতা মিনিসিপাল কর্পোরেশন নির্বাচন ঘোষণা করলো এবং দলটি এতে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। হিন্দু ও মুসলমান উভয় আসনে স্বরাজ দল সহজেই বিজয় লাভ করেছিলো। দেশবন্ধু কলকাতার প্রথম মেয়র এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি ডেপুটি মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হলো। দেশবন্ধুর নির্দেশে সুভাষ চন্দ্রকে চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার, অর্থাৎ মিনিসিপাল প্রশাসনের প্রধান করা হয়েছিলো। তাঁকে নিয়োগ দেয়ায় সরকার বিভ্রান্তিতে পড়ে গিয়েছিলো এবং অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর তারা এর অনুমোদন দিয়েছিলো।

দেশবন্ধু মেয়র এবং সুভাষ বসু চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার হওয়ার মাধ্যমে স্বরাজ দলের কলকাতা কর্পোরেশন দখলের ঘটনাকে ভারতে নাগরিক অগ্রগতির নতুন দিগন্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মেয়র হিসেবে দেশবন্ধুর নীতি ছিলো নাগরিক অধিকার, নগরের অগ্রগতি ও নাগরিক স্বাধীনতা। সুভাষ চন্দ্রের দায়িত্ব ছিলো সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। প্রথমবারের মতো খাদি নগর কর্মীদের অফিসিয়াল পোশাক হয়ে উঠলো এবং ভারতের মহান পুরুষদের নামে অনেক রাস্তা ও পার্কের নামকরণ করা হলো। প্রথমবারের মতো দক্ষ একজন শিক্ষা কর্মকর্তার অধীনে কর্পোরেশন শিক্ষা বিভাগ চালু করলো। সারা শহরে ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য বিনামূল্যের প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হলো। সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতায় কর্পোরেশন নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে প্রত্যেক ওয়ার্ডে স্বস্থ্যকেন্দ্র শুরু করলো। দরিদ্রদের স্বস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন শহরে বিনামূল্যের ঔষধালয় খোলা হলো। এমনকি কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় শিশু হাসপাতাল খোলা হলো যেখান থেকে দরিদ্র অভাবগ্রস্থ শিশুদের বিনামূল্যে দুধ সরবরাহ করা হতো। চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার তাঁর কর্মসূচীতে অসাধারণ নৈপুন্য প্রদর্শন করেছিলেন। রাতদিন তিনি সর্বত্র সংরক্ষণ, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, রাস্তা সংস্কার এবং অন্যান্য কাজে রত ছিলেন। কয়েক মাসের মধ্যে সুভাষ চন্দ্র কর্পোরেশনের প্রশাসনে নতুন এক ভারসাম্য আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। ব্রিটিশ বিশিষ্টজনকে নাগরিক সম্বর্ধনা প্রদানের চর্চা বন্ধ করা হলো এবং তৎপরিবর্তে জাতীয়তাবাদী নেতাদের আগমনে সম্বর্ধনা জ্ঞাপনের প্রচলন করা হলো। জনমনে নাগরিক সচেতনাতা বৃদ্ধির জন্য কলকাতা মিউনিসিপাল গেজেট নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা চালু করা হয়েছিলো। ভারতীয় পণ্যের প্রসারের লক্ষ্যে একটি বাণিজ্যিক জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছিলো। সুভাষ চন্দ্র বসু চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে তাঁর বেতনের অর্ধেক গ্রহণ করতেন এবং বাকি অর্ধেক জনকল্যাণে দান করতেন।

যখন স্বরাজ দল কলকাতা কর্পোরেশনকে এগিয়ে নিচ্ছিলো এবং বেঙ্গল কাউন্সিল ও ভারতীয় বিধান সভার অধিবেশনে তাঁদের পরিকল্পনা সফলভাবে এগিয়ে নিচ্ছিলো, তখন দেশবন্ধু বাংলার হুগলি জেলার তারাকেশ্বর মন্দিরের পরিচ্ছন্নতা ও এটাকে জনগণের জন্য উন্মুক্তকরণের লক্ষ্যে সত্যগ্রহ আন্দোলন শুরু ও সংগঠিত করার জন্য বেঙ্গল কংগ্রেস কমিটির সভা আহ্বান করলেন এবং সুভাষ চন্দ্র বসু ছিলেন উক্ত সভার সাধারণ সম্পাদক। এই আন্দোলনটি পাঞ্জাবে শিখদের তীর্থস্থানগুলো জনকেন্দ্রীক করার আকালি আন্দোনের মতো গতি অর্জন করেছিলো। কংগ্রেস তারেকেশ্বরের দিকে অগ্রসর হলে সরকার স্বৈরাচারী মোহান্তের পক্ষে দাঁড়িয়ে নির্দয়ভাবে আক্রমন করলো। এই আন্দোলনে বাংলার জনতা দারুণভাবে সারা দিয়েছিলো।

১৯২৪ সালের মে মাসে বেঙ্গল কংগ্রেসের সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত সভায় দেশবন্ধু হিন্দু এবং মুসলমান-এর মধ্যে এক চুক্তির প্রস্তাব করলেন যা ইতিহাসে বেঙ্গল প্যাক্ট নামে পরিচিত। এতে ধর্মীয় বিষয়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক অনেক প্রশ্নের সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিলো এবং মুসলমানরা যেসব সেবা ও সুবিধা থেকে বঞ্চি ছিলো, সেসব বিষয়ে তাদের বিশাল ছাড় দেয়া হয়েছিলো। বিপুল পরিমানে বিরোধীতা থাকা সত্বেও দেশবন্ধু দিনব্যাপী সভা চালিয়ে বেঙ্গল প্যাক্ট-এর অনুমোদন করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে সুভাষ চন্দ্র বসু তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনব্যাপী তাঁর নেতার ন্যায় ও উদারতার ভিত্তিতে সমস্ত সাম্প্রদায়িক প্রশ্নের সমাধান করার এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছেন। এই সভায় আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবিধান ছিলো তরুণ বিপ্লবী গোপীনাথ সাহার শহীদ হওয়া, যে কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলো। বিপ্লবী সন্ত্রাস ও সহিংষুতা সম্মন্ধে দেশবন্ধু ও সুভাষ বসুর একই রকমের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো। তাঁরা জাতীয় সংগ্রামে কোনো ধরনের স্বসস্ত্র সন্ত্রাসবাদকে অনুমোদন দিতেন না। কিন্তু জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে কিছু আদর্শিক যুবকের সন্ত্রাসবাদে আত্মোৎসর্গ করার মাধ্যমে দেশপ্রেমের প্রকাশের ঐতিহাসিক সত্যকে তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন। ফলে এই চুক্তি ছিলো জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য অনিবার্য বিস্ফোরণ। তাঁদের পদ্ধতি গ্রহণ না করা সত্বেও, দেশবন্ধু ও সুভাষ ওই সব বিপ্লবীদের স্বদেশপ্রেম, আদর্শ ও আত্মোৎসর্গের চেতনার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

১৯২৪ সালের মাঝামাঝি স্বরাজ দল এবং এর নেতা দেশবন্ধুর প্রভাব ও মর্যাদা নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। আগস্ট মাসে কলকাতায় বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হলে, সেখানে বিপুল উপস্থিতি ও উদ্দিপনা লক্ষ্য করা যায়। স্বরাজ দলের একটার পর একটা সাফল্য দেখে ব্রিটিশ সরকার আর অপেক্ষা করতে পারলো না। নিছক হতাশা থেকে তারা সংগঠনটির মূলোৎপাটন করার সিদ্ধান্ত নিলো। ২৫ অক্টোবর ১৯২৪ খুব ভোরে সুভাষ চন্দ্র বসুকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলা হলো যে তাঁকে কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার ডেকে পাঠিয়েছে। আলোচনা কালে ডেপুটি কমিশনার তাঁকে বলেছিলো, ‘মি. বসু, ১৮১৮ সালের প্রতিবিধান-৩ মোতাবেক আমার কাছে আপনাকে আটকের আদেশ আছে’। সুভাষ চন্দ্রের সাথে স্বরাজ দলের বেঙ্গল কাউন্সিল-এর আরো দুজনকে আটক করা হয়েছিলো।

১৯২৪ সালের অক্টোবর মাসে বিপ্লবীদের ষড়যন্ত্রের নাম করে ব্রিটিশ সরকার বাংলায় বিপুল পরিমাণ লোককে আটক করেছিলো। দুটি এংলো-ইন্ডিয়ান পত্রিকায় অভিযোগ করা হয় যে সুভাষ চন্দ্র বসু ‘বিপ্লবী ষড়যন্ত্রকারীদের মাথা’। সুভাষ চন্দ্রের পক্ষ থেকে আদালতে তাদের মানহানির অভিযোগ মোকাবেলা করতে হয়েছিলো। সরকার কিংবা সরকারি মদদপুষ্ট পত্রিকাওয়ালারা তাদের অভিযোগের পক্ষে কোনো ধরনের দালিলিক প্রমাণ দিতে সক্ষম হয়নি। তারপরো, বিনা বিচারে সুভাষ চন্দ্র এবং বাংলার অন্যান্য তরুণ নেতৃবর্গকে প্রায় তিন বছরের মতো আটক করে রাখা হয়েছিলো।

সুভাষ চন্দ্রকে আটকের প্রতিবাদে মেয়র হিসেবে দেশবন্ধু কর্পোরেশনে এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন। তাঁর চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারের কৃত সকল কাজের দায়ভার তিনি গ্রহণ করেন এবং তীক্ষè কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন: ‘দেশকে ভালোবাসা যদি অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে আমিও একজন অপরাধী…শুধুমাত্র কর্পোরেশনের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারই দোষী নয়, মেয়র সয়ং একই অভিযোগে অভিযুক্ত’।

কারাগারে বসেই একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং একজন জেল কর্মকর্তার উপস্থিতিতে প্রায় চয় সপ্তাহের জন্য সুভাষ বসুকে কর্পোরেশনের দায়িত্ব পালনের অনুমতি প্রদান করা হয়েছিলো। এই কর্মকর্তাদের সাথে তাঁর প্রায়ই ঝামেলা হতো এবং তাদের তীব্রভাবে তিরস্কার করতেন। এর শাস্তিস্বরূপ তাঁকে কলকাতা থেকে দূরে বহরামপুর জেলে বদলি করা হয়েছিলো। দুএক মাস পরে হঠাৎ করে তাঁকে কলকাতা ফিরিয়ে আনা হয় এবং লালবাজার জেলহাজতে রাখা হয়, যেটা ছিলো পৃথিবীর অন্যতম নরকখানা। অন্ধকার থাকতে থাকতেই খুব ভোরবেলা সুভাষ চন্দ্রকে আরো সাতজন কয়েদির সাথে হাজত থেকে বের করে দুটো পুলিশ ভ্যানে ওঠানো হয় এবং নদীর ঘাটের দিকে উচ্চ গতিতে ভ্যান চালিয়ে নেয়া হয়। তিন ঘন্টা ইস্টিমার চালিয়ে তাঁদের বার্মার উদ্দেশ্যে একটি জাহাজে উঠানো হয়েছিলো।

চার ঘন্টার সমুদ্র যাত্রার শেষে রাষ্ট্রীয় বন্দিরা রেঙ্গুনে গিয়ে নামলো। স্বসস্ত্র পুলিশি প্রহরায় দিনব্যাপী ট্রেন যাত্রার শেষে বন্দিদের মান্দালয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মান্দালয় কারাগারে নিয়ে যাওয়ার পর সুভাষ বসু এই ভেবে গর্ব বোধ করেছিলেন যে এখানে লোকমান্য তিলক ছয় বছর এবং লালা লাজপাত রায় প্রায় একবছর বন্দি ছিলেন। মান্দালয়ের কারাগারের অভ্যন্তর ভারতের কারাগার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলো। তাঁদের কাঠের ঘরে রাখা হলো যেখানে বন্দিদের জন্য শীতের তীব্র ঠা-া, গ্রীষ্মের প্রচ- তাপ, ধূলাবালি বা মান্দালয়ের মৌসুমী বৃষ্টি প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। যদিও মান্দালয়য়ের জেল সুপারিনটেন্ডেন্ট ও অন্যান্য কর্মকর্তা স্বাভাবিক ব্যবহার করেছিলো, কিন্তু বাংলার সরকার বন্দিদের উপর ছিলো প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং ভারতীয় সরকার এ ব্যাপারে ছিলো উদাসীন।

সুভাষ চন্দ্র তাঁর জনসেবা কার্যক্রমের শিক্ষনবিশী প্রথম ধাপ কাটিয়েছেন দেশবন্ধুর অধীনে। ভবিষ্যতে ভারতের জন্য ভূমিকা পালন করার প্রস্তুতিমূলক দ্বিতীয় অধ্যায় কাটান বার্মার জেলখানায়। বার্মার কারাকক্ষ থেকে এক বন্ধুকে লেখা চিঠিতে সুভাষ তাঁর জীবনের বর্ণনা দিয়েছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়:

“I still reside in the world of imagination,
The forest (prison) is the seat of my kingdom,
Only the silent contemplation is still my refuge,
……………………………………….
I am growing up to be a man nursed by the rocks,
……………………………………….
I am building my mind all by myself
and growing worthier for the tasks ahead.
Who knows when shall I be able to declare with all my heart:
I have reached my Realisation,
Come all, follow me,
The master is calling you all
May my life bring forth new life in all you
And thus may my country awake!”

সুভাষ চন্দ্র কঠিন আত্মোপলব্ধি এবং নির্বাসনের কঠিন ও কঠোর জীবনেও পড়াশুনায় মনোনিবেশের মধ্য দিয়ে তাঁর সময় কাটিয়েছিলেন। এমনকি কারাগারের নোটবুকগুলোর দিকে একটু চোখ বুলালেই যে কেউ বুঝতে পারবে যে তিনি কতো বিস্তৃত বিষয়ের উপরে অধ্যায়ন করেছেন এবং মান্দালয়ের নির্জন কারাকক্ষে বসে লিখেছিলেন। এসব বিষয়ের মধ্যে ছিলো দর্শন ও ধর্ম, ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান, শিল্প ও সংস্কৃতি, যার মধ্যে ছিলো রবীন্দ্র সঙ্গীত, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, কারাসংস্কার, নাগরিক অগ্রগতি ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি বার্মার ইতিহাস, রজনীতি ও জনসাধারণ সম্পর্কে গভীর অধ্যায়ন করেছিলেন। দীর্ঘ কারাবাস কালে তিনি তাঁর পরিবার বিশেষ করে ভাই শরৎ চন্দ্র, বন্ধুদের, সহকর্মীদের সাথে সাথে সরকারের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন। তাঁর চিঠি গুলোতে তিনি অসংখ্য বিষয়ে লিখেছেন এবং আলোচনা করেছেন। সামাজিক সংগঠনের সহকর্মীদের কাছে লেখা চিঠিতে তিনি সামনে এগিয়ে যাবার ব্যাপারে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সরকারের বরাবর লেখা তাঁর চিঠিগুলো থেকে দেখা যায় যে অধীনস্থ দেশের রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার ও সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি তখনো সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

১৯২৫ সালের অক্টোবর মাসে সুভাষ চন্দ্র ও তাঁর সঙ্গী অন্যান্য বন্দিরা জেলের মধ্যে দুর্গাপূজা পালনের জন্য সুবিধা ও তহবিলের দাবি করলেন। যদিও জেলসুপার প্রথমে সরকারি বরাদ্ধের অনুমতি দিয়েছিলো, কিন্তু পরে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিলো। তৎকারণে ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুভাষসহ অন্যান্য বন্দিরা অনশন ধর্মধট করেছিলো। পনেরো দিনের অনশন ধর্মঘটের পর সরকার নরম হয়েছিলো এবং তাঁদের দাবি মেনে নিয়েছিলো।

১৯২৬ সালের শেষ দিকে এসে আইন-সভা ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা করা হলো। বেঙ্গল কংগ্রেস উত্তর কলকাতা আসন থেকে সুভাষ চন্দ্র বসুকে তাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনিত করেছিলো। তাঁর শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছিলো বাংলার লিবারেল পার্টির একজন প্রার্থী যিনি বিগত নির্বাচনে স্বরাজ প্রার্থীকে পরাজিত করে জয় লাভ করেছিলেন। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিলো এবং অনেক দিনের রাজনৈতিক মন্দা অবস্থার পর সুভাষ চন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন জাতীয়তাবাদীদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক। সুভাষ চন্দ্র বসু বিশাল ব্যবধানে জয় লাভ করেছিলেন। তবুও, তাঁর কারাভোগ চলমান ছিলো।

কারাগারের দুর্বিসহ জীবন ও প্রতিকূল আবহাওয়ার সাথে ১৯২৬ সালের অনশন ধর্মঘটের কারণে সুভাষ বসুর স্বাস্থ্য দ্রুতগতিতে ভেঙে পড়ে। নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে কাঁপুনিসহ শরীরে অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে দ্রুত ওজন হারিয়েছিলেন। রেঙ্গুনের এক মেডিকেল বোর্ডের কাছে পাঠানো হলে তাঁরা তাঁকে কারাগারে না রাখার পরামর্শ দিয়েছিলো। ফলশ্রুতিতে তাঁকে ইসসেইন জেলে স্থানান্তরিত করা হয়েছিলো এবং সেখানকার জেলসুপার সরকারের কাছে জরুরী বার্তা পাঠালেও সরকার নরম হলো না। সরকার তাঁর কাছে প্রস্তাব পাঠালো যে তিনি যদি রেঙ্গুন থেকে ভারতের মাটি স্পর্শ না করে ইউরোপের উদ্দেশ্যে জাহাজে উঠতে রাজি হয় তাহলেই তাঁকে মুক্তি দেয়া হবে। সুভাষ এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বার্মা কারাগারের মহাপরিদর্শকের কাছে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন: ‘আমি আমার জীবনের চেয়ে সম্মানকে বেশি ভালোবাসি এবং আমি ওই সব পবিত্র ও অলঙ্ঘণীয় অধিকার থেকে দূরে সরে যেতে পারি না যা ভারতের আগামী রাজনৈতিক ভিত্তি হবে’। পরবর্তীতে সরকার তাঁকে যুক্তপ্রদেশের আলমোরা জেলে স্থানান্তরের নির্দেশ প্রদান করেছিলো। রেঙ্গুন থেকে তাঁকে একটি জাহাজে তোলা হলো এবং চারদিনের যাত্রা শেষে জাহাজটি হুগলি নদীর মুখে ডায়মন্ড হারবারে এসে পৌঁছেছিলো। কলকাতায় আসার আগেই তাঁকে বেঙ্গল গভর্নরের লঞ্চে স্থানান্তরিত করা হয়েছিলো যেখানে ড. নীল রতন সরকার, ড. বি.সি. রয় ও গভর্নরের চিকিৎসকসহ সরকারি একটি মেডিকেল বোর্ড তাঁর শারীরিক পরীক্ষা করেছিলো। পরের দিন সকালবেলা তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়। তখন ছিলো ১৯২৭ সালের মে মাস।

Spread the love
  • 17
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    17
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন