একগুচ্ছ কবিতা || তন্ময় মণ্ডল

 

দৃশ্যপট

একটা বিরাট স্থাপত্যের ভগ্নস্তূপে আমার বাস,
যেখানে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে আমার অতীত।
প্রশ্বাস আর নিঃশ্বাসের ব্যাবধানে
যেখানে পরাগরেনুর মত ভেসে বেড়াচ্ছে
অগনিত দৃশ্যপট…

আমি সেই বিরাট স্থাপত্যের বাসিন্দা
যার আকাশ-বাতাস
এমনকি চোখ ছুঁয়ে যাওয়া বৃষ্টিফোঁটাও
অবন্তিকাকে চেনে।

ঝরে ঝরে পড়া অতীত ক্রমশ স্তুপের আকার নিচ্ছে।
আর তার এককোণে শরীরহীন অবন্তিকার অবয়ব
আড়চোখে চেয়ে আছে আমার দিকে।

 

যন্ত্রণা

তার চেয়ে তুমি নির্জনতা দিও
হাড় হিম করা চূড়ান্ত অভিসার
যন্ত্রণা যদি কবচ করেও পরাও
ভেবে নেব এটা তোমারই তো অধিকার

আসলে ভালোবাসার পরে আর
নিজের বলে সত্যি কি কিছু থাকে?
যন্ত্রণা যদি তোমার দেওয়া হয়
সে কথা আমি বলবো বলো কাকে?

চোখের বাইরে চলে গিয়ে কী ভাবো,
কেউকি কাউকে এভাবে কখনো হারায়?
ভালোবাসলে যন্ত্রণা পেতে হবেই
ব্যথা-যন্ত্রণা আরো ভালোবাসা বাড়ায়।

 

 

কালবৈশাখী

তনুকে যে মনে পড়ে আজও
স্কুল জীবনের উষ্ণতামাখা হাত
বউয়ের সাথে ঝগড়া হলে তো রোজই
কান্না ভাঙে সে উষ্ণ জলপ্রপাত
জীবনের কাছে কত কিছু দাবি ছিল
সেসব এখন অচেনা পাখির পালক

মনের গভীরে স্মৃতির আল্পনারা
আগুন জোগায় ঠান্ডা বরফ দেহে
তনুকে দেখিনা বছর দশেক হল
তবুও কীভাবে তাকেই ছুঁয়ে ফেলি,
সন্দেহে সন্দেহে

কত বৈশাখে, বিদ্যুত চমকালে
জড়িয়ে ধরতো তনু
আমি যে কেবল হারিয়ে যেতেই জানি…

হারাতে হারাতে হারাবার ভয় নেই
সে ভয় এখন দূরের তারার আলো
ঝড়ের দিনে হঠাৎ মনে হয়
এই তো বোধ হয় বিদ্যুত চমকালো

বৈশাখ আসে, আসে কালবৈশাখী
বেখেয়ালে আজও সেই নাম ধরে ডাকি

 

 

কক্ষপথ

ফানুস হয়ে উড়ে যাচ্ছে অস্তগামী সূর্যের আলো
ঘুমচোখ দেখতে দেখতে ক্লান্ত স্বপ্নের অপমৃত্যু

নিরক্ষরেখা বরাবর হেঁটে যেতে যেতে
কোনো ফ্যারাওর পিরামিডের সামনে
থমকে যাওয়া পথিক জানে কক্ষচ্যুত হবার যন্ত্রণা

আদতে কক্ষ বলে কি সত্যিই কিছু থাকে !
নাকি সময় আমাদের কক্ষ তৈরি করে,
আর আমরাও পতঙ্গের মতো তাল মেলাই সময়ের ঘড়িতে
টিকটিক
টিকটিক
টিকটিক …

 

মায়াবী মুখোশ

চোখ বন্ধ করেও অনেক কিছু দেখা যায়।

ক্লান্ত শহরের শরীর থেকে
দু-চার ফোঁটা অন্ধকার তুলে নাও।
একটা টেস্টটিউবে রাখো।
এরপর বেখেয়ালে মিশিয়ে দাও স্মৃতির বুদবুদ

হলফ করে বলতে পারি
প্রিয়জন বলে যে অনাকাঙ্খিত গন্ডিকে চিনেছো এতকাল
দেখবে
তার বেশিরভাগই ধূসর চরিত্র পোড়া ছাই।

কিছু মুখ আর মুখোশের ব্যবধান সাধারণ চোখে ধরা পড়েনা

জীবনের অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হলে
একটু একটু করে খসে পড়ে মায়াবী মুখোশ

 

 

অপেক্ষা

কিছু শব্দের বুকে জেহাদী ক্ষতচিন্হ আঁকা থাকে
আর থাকে আগ্নেয় অপেক্ষার শীতলপাটি

যেখানেই যাই পিছু ছাড়ে না
থোকা থোকা ধারালো অপেক্ষারা…

থেমে থাকা সময় জানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠাটা কতটা জরুরী

গুরুত্ব
যেমন জলের কাছে স্রোতের
দিনের কাছে আলোর…

অপেক্ষার পাদদেশ সমুদ্রতল পেরিয়ে যায়
সেখানেও শুধু অপেক্ষাই রাখা থাকে

 

 

পালক জীবন

আমি এমন একটা জীবন চেয়েছি
যে জীবন
ছ’তলার ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া পালকের মতো

একটা প্রবাহমান স্রোত, একটা দিগন্ত বিস্তৃত স্বাধীনতা…

স্বপ্নে, দুঃস্বপ্নে আমি বরাবরই পালক জীবন প্রত্যাশী।

কালের শরীর থেকে খসে পড়া একটা ছোট্ট পালকই আমার জীবন।
যে জীবনে গন্তব্য নির্ধারিত নয়
শুধু ভেসে চলা আছে, আছে মুহূর্তযাপনের আনন্দ

 

 

কবি তন্ময় মণ্ডল। থাকেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উত্তর ২৪ পরগনায়। তন্ময় মণ্ডল পদার্থবিদ্যার ছাত্র হলেও, সাহিত্যের প্রতি নাড়ির টান। জীবনে একাধিকবার পেশা বদলেছেন। চারমাস কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি করার পর সেখানেও স্থায়ী হতে পারেননি। বর্তমানে তিনি সাংবাদিকতা করেন। ২০১৩ সাল থেকে ‘নবাঙ্কুর’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। সম্পাদিত গ্রন্থ : এপার বাংলা ওপার বাংলা (দুই বাংলার গল্প নিয়ে গল্প সংকলন) (২০১৩)। অ আ ক খ ভাষার কবিতা সংকলন (মাতৃভাষা বিষয়ক কবিতা সংকলন) (২০১৫)। প্রকাশিত গ্রন্থ : মৃত্যুকে খোলা চিঠি(কাব্যগ্রন্থ) (২০১৬)

Spread the love
  • 284
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    284
    Shares

আপনার মন্তব্য লিখুন